☰

সেরেস্তাদার বাবার স্বপ্ন পূরণ, বাঁশখালীর ছেলে গণি এখন সিভিল জজ

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
সেরেস্তাদার বাবার স্বপ্ন পূরণ, বাঁশখালীর ছেলে গণি এখন সিভিল জজ পিতার সাথে হাস্যোজ্জ্বল রেজাওনুল ইসলাম গণি— বাঁশখালী টুডে
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী>> একসময় ছিল ভিটেমাটি, ফসলি জমি আর পূর্বপুরুষের স্মৃতিমাখা গ্রাম। কিন্তু সাঙ্গু নদীর ভাঙনে একে একে হারিয়ে গেছে সব। যে পরিবারের পূর্বপুরুষদের কাছে মানুষ জানতে চাইত, ‘তোমাদের কবর কোথায় হবে?’ সেই পরিবারের সন্তানদেরই আজ ভাবতে হয়, কোথায় হবে তাদের শেষ ঠিকানা! জীবনের এমন নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও স্বপ্নের প্রদীপ নিভতে দেননি নিজামুল হক। সীমিত আয়, অভাব-অনটন আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন তিনি। সেই আলোয় এবার যুক্ত হয়েছে নতুন এক গৌরবের অধ্যায়-সেরেস্তাদারের ছেলে রেজাওনুল ইসলাম গণী এখন সিভিল জজ হওয়ার পথে।

বাঁশখালীর প্রেমাশিয়া গ্রামের মৌলভীপাড়ার বাসিন্দা নিজামুল হক (৫৫) বর্তমানে পটিয়া চৌকি আদালতে সেরেস্তাদার হিসেবে কর্মরত। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক তিনি। একসময় সাঙ্গু নদীর ভাঙনে হারিয়েছেন বসতভিটা, ফসলি জমিসহ বহু সম্পদ। ২০১৪ সালে জন্মভূমি ছেড়ে একই উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নের চন্দ্রপুর গ্রামে আশ্রয় নেন। সেখানে সরকারি খাসজমিতে কিছুদিন বসবাসের পর জীবিকার প্রয়োজনে বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের বাদুরতলা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকছেন।

জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি আর সীমিত সামর্থ্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। কিন্তু সন্তানদের শিক্ষিত করে মানুষের মতো মানুষ করার স্বপ্ন থেকে কখনো সরে আসেননি। সেই স্বপ্নের পথ ধরেই সদ্য প্রকাশিত ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১০৪তম স্থান অর্জন করে চূড়ান্তভাবে সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তাঁর দ্বিতীয় ছেলে রেজাওনুল ইসলাম গণী। বাঁশখালী থেকে এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া একমাত্র প্রার্থী হিসেবে তাঁর এই অর্জন নতুন করে গর্বিত করেছে নিজ এলাকা ও পরিবারকে।

ভাঙনের ক্ষত বুকে নিয়েও স্বপ্নের বীজ বুনেছেন বাবা

নিজামুল হকের জীবনের গল্প অভাবের সাথে আপস না করে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার এক নিরন্তর সংগ্রামের গল্প। নিজের জীবনের কঠিন সময়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন নিজামুল হক। তিনি বলেন, ‘যে নিজে চেষ্টা করে, আল্লাহ তার সহায়ক হন। মানুষ নিজেই নিজের মিস্ত্রি। আমি একজন ছোট চাকরিজীবী। আমার নুন আনতে পান্তা ফুরায়। ১৯৯৬ সালের কথা। নতুন বিয়ে করেছি, বিয়ের দেনা-পাওনাও ছিল। সব মিলিয়ে ১ হাজার ২২০ টাকা নিয়ে শহরে এসেছিলাম। এমন দিনও গেছে, একদিন ভাত না খেয়ে সাতটি বাটারবান খেয়ে দিন কাটিয়েছি।’

একসময় ছেলেকে চিকিৎসক হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। নিজের এলাকার মানুষের চিকিৎসাবঞ্চনার কথা ভেবে চেয়েছিলেন, ছেলে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু নিয়তির নির্মমতায় সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

নিজামুল হক বলেন, ‘আমার আশা ছিল ছেলেকে ডাক্তার বানাব। দেশের মানুষের সেবা করবে। আমাদের গ্রামটি অজপাড়াগাঁ। সেখানকার মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনে আমার বাড়িভিটা হারিয়ে গেছে। অনেক সম্পদ নদীতে চলে গেছে।’

জন্মভূমি প্রেমাশিয়া ছেড়ে চার ভাই পুকুরিয়ায় এসে টিনশেড বাড়ি করে পাহাড়ে বসবাস শুরু করেন। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো-সবকিছুই ছিল কঠিন। কিন্তু সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

নিজামুল হক বলেন, ‘প্রেমাশিয়া ছেড়ে আমরা চার ভাই পুকুরিয়ায় এসে টিনশেড বাড়ি করে পাহাড়ে বসবাস শুরু করি। বিভিন্ন গ্রামের মানুষ সেখানে এসে বসতি গড়েছিল। সবার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও সহজ ছিল না। তখন ভাবলাম, সন্তানদের তো মানুষ করতে হবে।’

দুই নম্বরের আক্ষেপ, অন্য পথে সাফল্যের শিখরে

রেজাওনুল ইসলাম গণীর ছোটবেলার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়া। মা-বাবারও ইচ্ছা ছিল, ছেলে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করবে। কিন্তু একটি দুর্ঘটনার কারণে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রত্যাশার তুলনায় জিপিএ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার মেধাস্কোরে।

২০১৮ সালের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রয়োজনীয় নম্বরের তুলনায় মাত্র দুই নম্বর পিছিয়ে পড়েন তিনি।  ভর্তি পরীক্ষায় ২৬৫ নম্বরের হিসাবের মধ্যে তিনি পেয়েছিলেন ২৬৩। কিন্তু এসএসসির জিপিএ-সংক্রান্ত নম্বর কর্তনের কারণে মেধাক্রমে পিছিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত সরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ থাকলেও পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল না।

তবে একটি স্বপ্নের দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও থেমে থাকেননি তিনি। চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাতালিকায় স্থান পেলেও শেষ পর্যন্ত কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেন। সেখানে মেধাতালিকায় তাঁর অবস্থান ছিল ১৮তম।

রেজাওনুল ইসলাম বলেন, ‘সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগেও ভর্তির সুযোগ এসেছিল। সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েই মেধাতালিকায় ১০০ থেকে ১৫০-এর মধ্যে আমার নাম ছিল। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮তম হয়ে আইন বিষয়ে পড়ার সুযোগ পাই।’

বাবার একটিই কথা ‘জুডিশিয়ারি হতে হবে’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় ভালো ফলাফল, মেধার স্বীকৃতি কিংবা অন্য কোনো চাকরির সাফল্য-কোনোটিতেই পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে চাননি বাবা নিজামুল হক। ছেলের জন্য তাঁর প্রত্যাশা ছিল নির্দিষ্ট-বিচার বিভাগে যোগদান।

রেজাওনুল ইসলাম গণী আইন বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে পেয়েছেন ভাইস চ্যান্সেলর অ্যাওয়ার্ড-২০২৪। প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০২৪-এর জন্যও মনোনীত হয়েছেন তিনি। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষায় সারাদেশে প্রথম হওয়ার কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর।

কিন্তু এসব অর্জনের পরও বাবার প্রত্যাশা পূরণের জন্য আরও এগিয়ে যেতে চেয়েছেন তিনি।

রেজাওনুল ইসলাম গণী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হলাম, তখন আব্বু-আম্মুকে ফোন করে খুশির খবর জানাই। কিন্তু আব্বু বললেন, যেদিন জুডিশিয়ারি হবি, সেদিন খুশি হব। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদেও আমি সারাদেশে প্রথম হয়েছিলাম। তখনও বাবা বলেছিলেন, এটা হবে না, জুডিশিয়ারি হতে হবে। বাবা সবসময় আমাকে বিচার বিভাগে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন।’

 ২০১৬ সালে বাকলিয়া সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ২০১৮ সালে হাজেরা তাজু ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। পরে আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন ২০২৪ সালে এবং স্নাতকোত্তর শেষ করেন ২০২৬ সালে।

বন্ধুর ছবির পেছনে লেখা স্বপ্ন, আজ বাস্তব

রেজাওনুল ইসলাম গণীর কাছে এমন একটি স্মৃতি ছিল। তাঁর বন্ধু রোবায়েত ১৭তম জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিচারক হন। বন্ধুর একটি পাসপোর্ট আকারের ছবির পেছনে একদিন নিজের স্বপ্ন লিখে রেখেছিলেন রেজাওনুল; ১৮তম পরীক্ষায় তিনিও বিচারক হবেন।

সেই ছবি মানিব্যাগে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। যখন অন্যরা আনন্দে মেতে থাকতেন, তখন তিনি বই নিয়ে বসতেন। ব্যর্থতার মুহূর্তে ছবিটি বের করে নিজের লেখা বাক্য পড়তেন, আবারও নতুন করে প্রস্তুতি শুরু করতেন।

তিনি বলেন, ‘১৭তম পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি পাস করতে পারিনি। তিন-চারটি প্রশ্ন ভুল হয়েছিল। যখন সবাই আনন্দ করত, আমি তা পারতাম না। তখন মানিব্যাগ থেকে বন্ধুর ছবিটি বের করে পেছনে লেখা কথাগুলো দেখতাম। ভাবতাম, দিনশেষে নিজের কাছে দেওয়া কথা আমাকে রাখতেই হবে। তাই পড়াশোনার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।’

অবশেষে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষায় ১০৪তম স্থান অর্জন করে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেন তিনি। মানিব্যাগের ভেতর লুকিয়ে রাখা ছোট্ট প্রতিজ্ঞাটি হয়ে ওঠে জীবনের বড় এক অর্জন।

অভাবের সংসারে শিক্ষাই ছিল সবচেয়ে বড় সম্পদ

সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজামুল হককে প্রতিমাসে আয়ের হিসাব কষতে হতো। নিজের সীমিত বেতনের মধ্য থেকেই চার সন্তানের জন্য ভাগ করে রাখতে হতো প্রয়োজনীয় অর্থ। কোনো মাসে বাজার-সদাই করাও কঠিন হয়ে পড়ত। তবু শিক্ষার ব্যয়ে যতটা সম্ভব ছাড় দেননি।

নিজামুল হক বলেন, ‘এমন সময়ও গেছে, বাজার-সদাই করতে পারিনি। আমার ছেলেরা এখনো মাছ-মাংস চায় না। আলুভর্তা পেলেই খুশি হয়ে যায়। তারা সাদাসিধে জীবনযাপনে বিশ্বাসী।’

নিজের আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার মতো অনেক পেশকার-সেরেস্তাদার আছেন, যাঁদের দুই-তিনটি বিল্ডিং আছে। কিন্তু আমি কিছু করতে পারিনি। যেখানে কম ভাড়ায় ঘর পাওয়া যায়, সেখানে থাকছি।’

অভাবের এই বাস্তবতার মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষার পথ বন্ধ হতে দেননি তিনি। রেজাওনুলকে প্রতিমাসে সাত থেকে দশ হাজার টাকা পাঠাতেন। সেই টাকা দিয়ে থাকা-খাওয়া, বই কেনা ও পড়াশোনার খরচ চালাতেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে দুই-তিনটি টিউশনি করাতেন রেজাওনুল। গণিত ও বিজ্ঞান পড়িয়ে নিজের কিছু ব্যক্তিগত খরচ মেটানোর পাশাপাশি পড়াশোনার চর্চাও ধরে রাখতেন।

হলের বাইরে থেকে একাগ্রতার লড়াই

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে রেজাওনুল ইসলাম গণী কখনো আবাসিক হলে থাকেননি। পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার কথা ভেবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি ভাড়া বাসায় থাকতেন। সে সময় হলের পরিবেশে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার চাপ ছিল বলে তিনি মনে করতেন। তাই নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে চাননি।

রেজাওনুল বলেন, ‘হলে থাকলে রাজনীতিতে যেতে হবে, মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতে হবে-এমন একটা চাপ ছিল। আমার অনেক বন্ধু এই পরিস্থিতিতে আটকে গিয়েছিল। আমি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতাম। কারণ, রাজনীতি আমার ভালো লাগত না। বাবাও আমাকে রাজনীতি থেকে দূরে থেকে পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিতেন।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে তাঁর জন্য কক্ষ বরাদ্দ হলেও সেখানে ওঠেননি। বাবাও চেয়েছিলেন, ছেলে যেন নির্বিঘ্নে পড়াশোনা করতে পারে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অদূরে ভাড়া বাসায় থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি।

জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি ছিল আরও কঠিন। বিস্তৃত পাঠ্যসূচি, দীর্ঘ সময় পড়াশোনা এবং মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। পরীক্ষার আগের দিনগুলোতে ঘুমের সময়ও কমে এসেছিল।

রেজাওনুল বলেন, ‘জুডিশিয়ারির পরীক্ষা খুব কঠিন। এমন দিন গেছে, বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া হয়ে গেছে, মাথা গরম হয়ে গেছে। আবার বই হাতে নিয়ে পড়তে বসেছি। পরীক্ষার ১০ দিন আগে মনে হতো, প্রতিদিন তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারতাম না। কারণ, সিলেবাস অনেক বড়।’

মায়ের তাহাজ্জুদ, ভাইয়ের দোয়া

সাফল্যের পেছনে নিজের পরিশ্রমের পাশাপাশি মা-বাবা ও বড় ভাইয়ের দোয়াকে সবচেয়ে বড় শক্তি মনে করেন রেজাওনুল ইসলাম গণী। তিনি বলেন, ‘আব্বু-আম্মু নামাজ পড়ে আমার জন্য দোয়া করতেন। মা আমার জন্য তাহাজ্জুদ নামাজ পর্যন্ত পড়েছেন। বড় ভাইও একদিন তাহাজ্জুদ নামাজ বাদ দেননি। মা আমার জন্য অনেক রোজা রেখেছেন। মা-বাবার দোয়া আল্লাহ কখনো ফিরিয়ে দেন না-এ কথায় আমি বিশ্বাস করি।’

নিজামুল হক বলেন, ‘আমার ছেলে গণী আত্মীয়স্বজনের বিয়ের দাওয়াতেও যেত না। সে সময়কে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। আমি হয়তো সন্তানদের জন্য বিল্ডিং করে দিতে পারব না, কিন্তু লেখাপড়াই একটি বিল্ডিং, লেখাপড়াই একটি সম্পদ।’

‘জমিদারের ছেলে’ থেকে নদীভাঙনে নিঃস্ব

নিজামুল হকের জীবনের সবচেয়ে গভীর ক্ষত তাঁর হারানো জন্মভূমি। প্রেমাশিয়া গ্রামে এখনো তাঁর দুই বোন বসবাস করেন। কিন্তু যে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি একসময় তাঁদের পরিবারের পরিচয়ের অংশ ছিল, তার অনেকটাই এখন সাঙ্গু নদীর গর্ভে বিলীন।

আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমি একসময় জমিদারের ছেলে ছিলাম। নদীভাঙনে ফকির হয়ে গিয়েছি। আমাদের গ্রামের মানুষ আমার আব্বা ও জেঠার কাছে জিজ্ঞেস করতেন, তোমাদের কবর কোথায় হবে? কিন্তু আজ আমাকে চিন্তা করতে হচ্ছে, আমার কবর কোথায় হবে? আমাদের কবরস্থানও নদীতে চলে গেছে।’
 
বিচারকের আসনে বসে যেন ন্যায়ের পথেই থাকেন

ছেলেকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘একজন বিচারকের তিনটি গুণ থাকা দরকার-সততা, সাহসিকতা ও দক্ষতা। এই তিনটি গুণের সমন্বয়ে একজন বিচারক দায়িত্ব পালন করেন। এর কোনো একটি না থাকলে দায়িত্ব পালনে বিচ্যুতি ঘটতে পারে। এই গুণগুলো থাকলে সে আল্লাহর কাছেও গ্রহণযোগ্য হবে, মানুষের কাছেও সম্মান পাবে।’

বাবার এই প্রত্যাশার সঙ্গে একমত রেজাওনুল ইসলাম গণীও। তাঁর কাছে বিচারকের পদ মানে দায়িত্ব, জবাবদিহি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার।

‘সেরেস্তাদারের ছেলে এখন জজ-এ অনুভূতি কেমন?’ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনুভূতির চেয়ে দায়িত্বটা বেশি। একজন বিচারক হিসেবে যদি ভুল রায় দিই, অন্যায় করি, তাহলে কেয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে। জনগণকে যদি জবাব দিতে না পারি, তাহলে আল্লাহকে কীভাবে জবাব দেব? ন্যায়বিচারকের মর্যাদা অনেক বড়। যদি ন্যায়ের মধ্যে থাকতে পারি, তাহলে এই পেশা অত্যন্ত ভালো। এখন অনুভূতির চেয়ে দায়িত্বের চাপ বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্র আমাকে জনগণের বিচার করার দায়িত্ব দিচ্ছে। আমি যদি ভুল বিচার করি, তাহলে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকব। স্রষ্টার কাছেও দায়বদ্ধ থাকব, নিজের নীতি-নৈতিকতার কাছেও দায়বদ্ধ থাকব। তাই আমার এলাকার মানুষ, উপজেলার মানুষ—সবার কাছে দোয়া চাই, যেন নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারি।’

বাবার স্বপ্নের উত্তরাধিকার

রেজাওনুল ইসলাম গণীর বড় ভাই আরিফুল ইসলাম সরকারি সিটি কলেজ থেকে ফিন্যান্স বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাঁর এক বোন সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজে স্নাতক পর্যায়ে পড়ছেন। ছোট বোন পড়ছেন কৃষ্ণকুমারী সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও চার সন্তানের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন নিজামুল হক।

নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো সেই বাবার কাছে আজ সন্তানের সাফল্যই সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাঁর বিশ্বাস, দালানকোঠা না থাকলেও শিক্ষা মানুষকে সম্মানের আসনে বসাতে পারে। আর সেই শিক্ষার আলোয় গড়ে ওঠা বিচারক-পুত্রের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা-তিনি যেন সততা, সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে ন্যায়ের পথে অবিচল থাকেন।
815 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা