#তড়িঘড়ি করে সৎকারের অভিযোগ
#পুলিশকে না জানিয়ে লাশ সৎকার
#আধা ঘন্টায় সৎকারের ঘটনায় তোলপাড়
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী: বাঁশখালীর বাণীগ্রাম-সাধনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির এক ছাত্রের মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার মৃত্যুর পর তড়িঘড়ি করে সৎকার ও পুলিশকে না জানিয়ে ঘটনা ধামাচাপা এবং চাচা-জেঠাদের সাথে পূর্ব শত্রুতার বিষয়টি সামনে আসছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী স্কুল ছাত্র সুবর্ণ দে’র (১৬) পিতা বাদী হয়ে আদালতে একটি হত্যা মামলাও করেছেন।
তবে এলাকাবাসী বলছেন, ছেলেটির মৃত্যুর পর মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে প্রচার করা হয়েছিল।অন্যদিকে, মামলার বিবাদীদের দাবি, পারিবারিক কলহের কারণে ছেলেটি গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্নহত্যা করেছে। তবে সুবর্ণের পিতা-মাতার দাবি, পূর্ব শত্রুতার জেরে ঘরে কেউ না থাকার সুবাদে একা পেয়ে তাকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রেখেছে।
এদিকে সচেতন মহল বলছেন, বাঁশখালীতে ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত টানা বৃষ্টির ফলে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে এই সময়ে ঘটে যাওয়া স্কুল ছাত্র সুবর্ণের মৃত্যু পরবর্তী আধা ঘন্টায় লাশ সৎকার করা রহস্যজনক।
এ ঘটনায় গত ৩ আগস্ট সুখেন্দু বিকাশ দে বাদী হয়ে বাঁশখালী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
মামলার আসামিরা হলেন, দক্ষিণ বাণীগ্রাম মাস্টারপাড়ার ভূপতি দে’র ছেলে রুবেল দে (৩০), বানছারাম দে’র ছেলে ভূপতি দে (৫৪), ভূপতি দে’র স্ত্রী শিল্পী দে (৪০), বানছারাম দে’র ছেলে মৃদুল দে (৫৭), রুপন দে’র স্ত্রী চুমকি দে (৩৫) এবং রুবেল দে’র স্ত্রী মনি দে (২৫)।
মামলার আরজিতে উল্লেখ করা হয়, সুবর্ণ গত ১০ জুলাই তার ছেলে সুবর্ণ ঘুম থেকে উঠে চা-নাশতা খায়। সে সময় সুখেন্দু বিকাশ চাষাবাদের কাজে ফসলি জমিতে অবস্থান করছিলেন। তার স্ত্রী গিয়েছিলেন দুই কিলোমিটার দূরবর্তী একটি মন্দিরে প্রার্থনা করার জন্য। তখন সুবর্ণ একা বাড়িতে অবস্থান করছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আসামিরা সুবর্ণের শরীরে ভারী অস্ত্র ব্যবহার করে তার বুকে, মাথায়, শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে। আসামিরা পরিকল্পিতভাবে অজ্ঞাতনামা আসামিদের সহযোগিতায় সুবর্ণকে হত্যা করে লাশ ঘরের মেঝের মধ্যে শুইয়ে দেয়। এসময় খবর পেয়ে তার মা সজু দে ঘরে আসলে লাশ দেখে মূর্ছা যান।
এ বিষয়ে মামলার বাদী সুখেন্দু বিকাশ দে বলেন, ‘আমি ঘরে আসার পর আসামিরা আমাকে বলে সুবর্ণ অসুস্থতার কারণে মারা গেছে। তখন আমি আমার ছেলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আসামিরা আমার অনুমতি না নিয়ে তড়িঘড়ি করে আধা ঘন্টার মধ্যে ছেলের সৎকার করে ফেলে।’
সুখেন্দু বিকাশ বলেন, ‘আসামিরা এলাকায় প্রচার করেছে আমার ছেলে সুইসাইড করেছে। আত্মহত্যা করলে তো থানায় খবর দেওয়ার কথা। থানায় খবর না দিয়ে তারা তড়িঘড়ি করে মরদেহ সৎকার করেছে। আমার ছেলেকে হত্যায় ব্যবহৃত একটি গামছা এক আসামির কাছে খুঁজে পেয়েছি। আসামিরা হত্যার আলামত নষ্ট করার জন্য তড়িঘড়ি করে লাশ সৎকার করেছে পুলিশকে না জানিয়ে।’
সুবর্ণের মা সজু দে জানান, ‘সকালে আমার ছেলে দোকান থেকে নাশতা এনে খেয়েছে। আমার ছেলে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল। সুবর্ণের বন্ধুরা বলেছে, আধা ঘন্টা আগেও আমাদের সাথে কথা বলে গেছে। কিন্তু আধা ঘন্টায় লাশ সৎকার করায় তার বন্ধুরাও শেষ বারের মতো মুখ দেখার সুযোগ পাননি। যেখানে সাধারণত একটি লাশ সৎকার করতে ৩ থেকে ৪ ঘন্টা সময় লাগে, সেখানে আধা ঘন্টায় তড়িঘড়ি করে লাশ সৎকার করেছে। লাশ সৎকারে নেতৃত্ব দিয়েছে আমার ভাসুর ভূপতি দে।’
এলাকায় প্রচার করা হয় ‘মৃগী রোগে মৃত্যু’
সরেজমিনে গিয়ে স্কুল ছাত্র সুবর্ণের প্রতিবেশী অন্তত ডজনখানেক ব্যক্তির সাথে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। তাদের দাবি, মৃত্যুর পর ছেলেটি মৃগী রোগে মারা গেছে বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু সুবর্ণের পিতার দায়ের করা মামলার আসামিদের ভাষ্যে মৃগী রোগের বিষয়টি উঠে আসেনি। তাদের দাবি, সুবর্ণ আত্মহত্যা করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সনজয় দে বলেন, ছেলেটির মৃত্যুর পর সৎকারের জন্য সমাজের সবাইকে যখন ডাকা হয়েছিল, তখন প্রচার করা হয়েছিল মৃগী রোগে মারা গেছে। তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে একজনকে চা-নাশতার টাকা দিয়ে ডিক্লেয়ার করার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার চাচা ভূপতি দে আমাকে বলেছিল, সৎকারে অংশ নেওয়া সবার নাম লিখে রাখার জন্য। আমি ৫নম্বর ওয়ার্ড পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বিধায় আমাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমিসহ সবাই গিয়েছি, মৃগী রোগে মারা গেছে সে জন্য। অন্য কারণ থাকলে যেতাম না। কারণ এটাই প্রচার করেছে।
সনজয় বলেন, লাশ সৎকারের সময় তাদের পরিবারের লোকজন ছাড়া সমাজের সবার নাম লেখার জন্য বলা হয়। মৃগী রোগে মারা গেলে ঘরের চালায় ঝুলন্ত অবস্থায় ছিল কেন?— এমন প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি সনজয়।
স্থানীয় বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অসিত কুমার সেন বলেন, আমিও শুনেছিলাম, মৃগী রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। কিন্তু সৎকার করার সময় শ্মশানে যাইনি। সুইসাইড করার বিষয়ে আমি জানি না।
সাধনপুর ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ টিপু কান্তি দে বলেন, আমাদের ধর্মের নিয়মানুযায়ী কেউ সুইসাইড করলে তড়িঘড়ি করে সৎকার করতে হয়। তাই সেদিন অতিবৃষ্টির কারণে কেরোসিনের পাশাপাশি গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ারও আনা হয় সৎকার কাজে ব্যবহারের জন্য।
সেদিন থানাকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে টিপু কান্তি দে বলেন, থানাকে বিষয়টি জানানো হয়নি। সরকারি কোনও আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই সৎকার করে ফেলা হয়। কাজটি আইনী প্রক্রিয়া মেইনটেইন করে করা হয়নি। এটি দুঃখজনক।
সুবর্ণের পিতা সুখেন্দু বিকাশ দে বলেন, আমাকে তারা বলেছে, পুলিশে নাকি আমাদেরকে ধরে ফেলবে এই জন্য তড়িঘড়ি করে লাশ সৎকার করেছে। আমি তাদেরকে বললাম, আমার ছেলে ফাঁস খেলে এরকম ভেজা বুড়া কেন? আমাদের খাটের ওপর একটি হাতুড়ি খুঁজে পেয়েছি। মুখে কালো দাগ ও বুকে আঘাত দেখেছি। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
বিবাদীরা যা বললেন
লাশ সৎকার কাজের নেতৃত্ব দিয়েছেন সুবর্ণের জেঠা ভূপতি দে। ভূপতি দে’র দাবি, তিনি সেদিন বীজতলায় ধানের বীজ বপনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। ঘটনা শোনার পর তিনি সেখান থেকে দৌড়ে গিয়েছিলেন ঘটনাস্থলে।
রুপন দে’র স্ত্রী চুমকি দে দাবি করেন, সুবর্ণের বাবা গরুর জন্য ঘাস কেটে এসে চিৎকার চেচামেচি শুরু করে। তখন আমরা সবাই এগিয়ে যাই। তখন আমরা কেউ সুবর্ণের শরীরে পানির ছিঁটকা দেই। আমরা প্রাণ আছে ভেবে পা মালিশ করেছি। আমাদের কারও তাদের শত্রুতা ছিল না।
এদিকে ভূপতি দে’র স্ত্রী শিল্পী দে বলেন, গাছ কাটা নিয়ে তর্কাতর্কি হয়েছিল বহু আগে। এখন আমাদের মধ্যে শত্রুতা নেই। সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ নেই। তার বাবা-মায়ের কারণে আত্মহত্যা করেছে। গরুর জন্য ঘাস না কাটলে ছেলেকে গালিগালাজ করত। সতিনের ছেলে মনে করত।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে জানত না পুলিশ প্রশাসনও
স্থানীয় ৫নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য করুণাময় ভট্টাচার্য বলেন, সেদিন বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শনে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বাঁশখালীতে এসেছিলেন। বাণীগ্রাম ‘দ্য কিং অব বাঁশখালী’ নামের কমিউনিটি সেন্টারে শফিক সাহেবের মিটিং ছিল। আমি সেখানে গিয়েছিলাম তখন। ওখান থেকে শহরে গিয়েছি। শহর থেকে আসার পর শুনলাম, ঐ ছেলেটি মারা গেছে। তখন আমি ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় তার জেঠা ভূপতির দেখা পেলাম। তখন ভূপতি আমাকে বলছে, ছেলেটিকে একটি মোবাইল কিনে দিয়েছিল তার মা-বাবা। ওই মোবাইলটি কেড়ে নিয়ে তার মা আলমারিতে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল। এ কারণে আত্মহত্যা করেছে।
মামলার প্রধান বিবাদী রুবেল দে’র দাবি, সৎকারের সময় ইউপি সদস্য করুণাময় ভট্টাচার্য শ্মশানে ছিলেন। এ বিষয়ে করুণাময় ভট্টাচার্য বলেন, এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আমি সেখানে ছিলাম না। আমি থাকলে তো পোস্টমর্টেম ছাড়া সৎকার হতো না। এটা তো আইনের ব্যাপার। সৎকার করা আমার সাধ্য ছিল নাকি? পোস্টমর্টেম ছাড়া এটি আইনবহির্ভূত কাজ হয়েছে। রুবেল কিংবা ভূপতি আমাকে ফোন করলেও আমি প্রশাসনকে বিষয়টি জানাতে পারতাম।
ইউপি সদস্য করুণাময় ভট্টাচার্য বলেন, প্রথম দিকে মৃগী রোগে মারা গেছে বলেও ছড়ানো হয়েছিল। আমিও এমনটি শুনেছি।
এ বিষয়ে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, আমাকে এই ঘটনা সম্পর্কে কেউ অবগত করেননি। রামদাস হাট পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রেও এই ঘটনা জানানো হয়নি। এই প্রথম আপনার কাছ থেকে শুনলাম। এখন যেহেতু, তার পিতা বাদী হয়ে মামলা করেছে সেটি তদন্তের পর প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। সিআইডি প্রসেসিং করলে অসুবিধা নেই।