☰

জলদস্যু হারুন ছনুয়ায় ফেরার গুঞ্জন, ক্ষোভে ফুঁসছে ছাত্র-জনতা, বিএনপি নেতারা

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
জলদস্যু হারুন ছনুয়ায় ফেরার গুঞ্জন, ক্ষোভে ফুঁসছে ছাত্র-জনতা, বিএনপি নেতারা জলদস্যু হারুনুর রশিদ— ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক: ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আ. লীগের সাবেক সভাপতি হারুনুর রশীদ দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর এলাকায় ফেরার খবর চাউর হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী হাসিনার পতনের পর আত্নগোপনে চলে যান হারুনুর রশীদ। মাসখানেক পর গোপনে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে পাড়ি জমান তিনি।

এরপর ছনুয়া ইউনিয়নে নাগরিক সেবা সচল রাখার লক্ষ্যে প্রশাসক নিয়োগ দেয় তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বর্তমানে প্যানেল চেয়ারম্যানের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ পরিচালিত হচ্ছে। 

আছে ডজনখানেক মামলা
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর হারুনুর রশীদের বিরুদ্ধে বাঁশখালীসহ আশেপাশের থানায় অন্তত ডজনখানেক মামলা হয়। এরমধ্যে একটি মামলায় তিনি হাইকোর্ট থেকে ৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান। পরবর্তীতে তাকে নিম্ন আদালতে আত্নসমর্পণের জন্য বলা হয়।

যুবদল নেতা হত্যা মামলায় কাঠগড়ায়
ছনুয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি আমান উল্লাহ আনুকে অপহরণের পর লাশ গুম করে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় হারুনুর রশীদ এজাহারভুক্ত আসামি। এছাড়াও তার ছোটভাই, ইউনিয়ন আ. লীগের সভাপতি আলমগীর কবির এবং আরেক ছোট ভাই আবদুল আজিজ টিপুকেও ওই মামলায় আসামি করা হয়। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট চট্টগ্রাম চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন নিহত আমান উল্লাহ আনুর বোন মমতাজ বেগম। আদালত তা আমলে নিয়ে আনোয়ারা থানাকে এফআইআর হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, আমান উল্লাহ আনুকে হত্যার পর লাশ গুমের ঘটনায় ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশীদ এবং তাঁর ছোট ভাই ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর কবিরসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন মমতাজ বেগম।

এই মামলার অন্য আসামিরা হলেন প্যানেল চেয়ারম্যান আরফাতুল ইসলাম এমরান, পুতু চৌধুরী, ইউনিয়ন মৎস্যজীবী লীগের সভাপতি আবদুল আজিজ টিপু, আবদুল মোমেন, আবদু সাত্তার, মো. হেলাল উদ্দিন এবং রোজিনা আক্তার। এজাহারে মমতাজ বেগম উল্লেখ করেছেন, আসামিরা সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং একটি সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্রের সদস্য।

এজাহারে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে চট্টগ্রাম শহর থেকে বাঁশখালী ফেরার পথে আমান উল্লাহ আনুকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে আটকে রাখা হয়। ১২ ফেব্রুয়ারি আনোয়ারা থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে মুক্তিপণ দাবি করা হলেও টাকা দেওয়ার পর আমান উল্লাহ আনুকে ছাড়া হয়নি। ৩ মার্চ তাঁকে ছনুয়া ইউপি চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশীদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অভিযোগ রয়েছে, সেখানে এম. হারুনুর রশীদের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করে বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়া হয়।

এর আগে ২০১৯ সালের ৪ মার্চ চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির কাছে অভিযোগ করে কোনো প্রতিকার না পেয়ে আদালতে মামলা করেছিলেন মমতাজ বেগম। তখন আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিলেও আসামিদের ভয়ভীতি ও হুমকির কারণে বাদী মমতাজ বেগম তদবির করতে ব্যর্থ হন, ফলে মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। মমতাজ বেগম জানান, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের পতনের পর গুম-খুনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তিনি ভাইয়ের হত্যার বিচারের আশায় দীর্ঘ সময় পর পুনরায় মামলাটি দায়ের করেছেন।

৩১ জেলে হত্যার নির্দেশদাতা
২০১৩ সালের ২৪ মার্চ বঙ্গোপসাগরে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর ৩১ জেলে হত্যা মামলার চার্জশিট ভুক্ত হারুনুর রশীদ।

২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর কক্সবাজার আদালতে ৩১ জেলে হত্যা মামলার অভিযোগপত্র জমা দেন মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির কক্সবাজার জেলা ইউনিটের তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার মো. নুরুল আমীন। তদন্ত শেষে ৮ বছর পর এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এতে পলাতক ২৬ জনসহ মোট ৩৬ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এ মামলায় সাক্ষী করা হয় ৪০ জনকে। একই বছর ১ ডিসেম্বর আদালতে ওই অভিযোগপত্র গ্রহণের ওপর শুনানি হয়।

আদালত সূত্র জানায়, উক্ত মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ৩১ জেলে হত্যার নেপথ্যে অন্যান্য অপরাধীদের পাশাপাশি বাঁশখালীর ছনুয়া ইউপি চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদের নাম উঠে আসে। তবে রহস্যজনক কারণে ঘটনায় তার সম্পৃত্ততার বিষয়টি তুলে ধরেননি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। আরও চেয়ারম্যান হারুনসহ ২৬ জনকে মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিতে আদালতে ‘প্রার্থনা’ করেন এ কর্মকর্তা।

কিন্তু গ্রেপ্তার হওয়া আসামি ওয়াসিমের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ছনুয়ার চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদের নাম আসায় তাকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র গ্রহণ করে আদালত। 

এর আগে ২০১৩ সালের ২৪ মার্চ রাতে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে গেলে জলদস্যুদের কবলে পড়েন তিন ফিশিং বোটের ৩৮ মাঝিমাল্লা। এরমধ্যে ৩১ জেলেকে হত্যা করে দুটি বোট এবং মাছ লুট করে নিয়ে যায় জলদস্যুরা। তিনজন জেলে তাদের কবল থেকে প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনায় ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল কুতুবদিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন ঘটনার শিকার বাঁশখালী শেখেরখীলের বাসিন্দা নিহত নেজাম উদ্দিনের ছোটভাই শাহাব উদ্দিন। এতে ৩০-৪০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। সিআইডি উক্ত মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ৩১ জেলে হত্যার ঘটনায় আলোচিত ‘চরিত্রের’ নাম বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের বিতর্কিত চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশিদ। যার বিরুদ্ধে শুধু বাঁশখালী নয়, কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানায় আছে সাংবাদিক অপহরণ, শিশু ধর্ষণ, সরকারি বনভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ ফৌজদারি অভিযোগে অন্তত ১২টি মামলা।

২০২০ সালের ২ আগস্ট একুশে পত্রিকার বাঁশখালী প্রতিনিধি মো. বেলাল উদ্দিনকে অপহরণ করেন চেয়ারম্যান এম হারুনুর রশিদের সহযোগিরা। জন্ম নিবন্ধন ইস্যু করতে অতিরিক্ত ‘ফি’ নেওয়ার বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করার জের ধরে বেলালকে অপহরণ করে হারুনের সহযোগী আশেক, মিয়া হোসেন, ছৈয়দুল মোস্তফা ওরফে বাক্কা, এমদাদ, নজরুল সিকদার, শাহাবুদ্দিন রাকিব, আশরাফ হোসাইন। পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যদের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে এক ঘণ্টার মধ্যে সাংবাদিক বেলালকে হারুনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় হারুনের ৫ সহযোগীর বিরুদ্ধে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়। এজাহারে হারুনের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও তাকে আসামি করা হয়নি।

এদিকে ১৯৯৮ সালে ১২ বছর বয়সী কাজের মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয় হারুনের বিরুদ্ধে। হারুন ১৯৯৭ সালে ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচত হন। ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল ছনুয়া ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এছাড়াও ২০২২ সালে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া হারুনের সহোদর মো. আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধেও নকল স্বর্ণ ব্যবসা, হত্যা, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আছে একাধিক মামলা। সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর দয়ায় ইউনিয়ন আ. লীগের কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পান আলমগীর কবির। 

জামায়াত নেতার কৃপায় বেঁচে যাওয়া হারুন কীভাবে এলাকায় ফিরছেন?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনার পতনের পর চাম্বল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আ. লীগের সভাপতি মুজিবুল হক চৌধুরীর বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। এরপর শেখেরখীল রাস্তার মাথা এলাকা থেকে ছাত্র-জনতা ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদের বাড়ি অভিমুখে রওনা দেয়।

অভিযোগ রয়েছে, সেদিন মিছিলের অগ্রভাগে থাকা এক জামায়াত নেতাকে ফোন করে আরেক জামায়াত নেতা নির্দেশ দেন যে, হারুনের বাড়িতে না যাওয়ার জন্য। এই যাত্রায় জনরোষ থেকে বেঁচে যাওয়ার পর দ্রুত গা ঢাকা দেন হারুন।

এবারও জামায়াতের সহযোগিতায় এলাকায় ফেরার গুঞ্জন
গুঞ্জন রয়েছে, এবার জামায়াতের সহযোগিতায় এলাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছে হারুন। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জামায়াত নেতা বলেন, হারুনের মতো একজন কুখ্যাত জলদস্যুকে কেন আমরা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেব? তাকে এলাকায় আনার প্রশ্নই আসে না।

টানা দুইবার চেয়ারম্যান হলেও ছনুয়া অবহেলিত
২০১৭ ও ২০২২ সালে টানা দুই মেয়াদে হারুনুর রশীদ ইউপি  চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও ছনুয়ার আনাচে-কানাচে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। উপজেলা সদর থেকে ছনুয়ায় প্রবেশের একটি রাস্তাও ঠিক নেই। অপরদিকে তার মেয়াদে ছনুয়া মনুমিয়াজী বাজার থেকে আরবশাহ্ বাজার পর্যন্ত রাস্তার এক ইঞ্চি পিচ ঢালাই দিতে পারেননি।

 ২০২১ সালে হারুনুর রশীদ একটি মাহফিলে বলেছিলেন, ২০২২ সালের ইউপি নির্বাচনের আগে ছনুয়া কাদেরিয়া সড়ক এক কিলোমিটার পর্যন্ত ঢালাই দিতে না পারলে তিনি আর কখনো নির্বাচন করবেন না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ২০১৮ সালে সংস্কারের জন্য ইট খোয়া কাদেরিয়া সড়ক ৭ বছরে আলোর মুখ দেখেনি। ছনুয়ার আরেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হিসেবে পরিচিত মাওলানা আশরাফ আলী সড়কেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। ফলে ছনুয়া সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, জরাজীর্ণ রাস্তা-ঘাটের কারণে ছনুয়ার তরুণ-তরুণীদের বিয়ে হচ্ছে না।

ফেসবুকে ক্ষমতার জানান দিলেন হারুনুর রশীদ
হারুনুর রশীদ তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, ‘আই উইল কামব্যাক’। অপরদিকে তার অনুগত সন্ত্রাসীরাও ফেসবুকে সাম্প্রতিক সময়ে লেখালেখি করছেন। তার লিখেছেন, হারুন শিগগিরই বীরের বেশে ছনুয়ার মাটিতে পা রাখবেন।

এ বিষয়ে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনও তৎপরতা বাঁশখালীতে চলবে না। হারুনের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে অবশ্যই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

ঐক্যবদ্ধ ছাত্র-জনতা ও বিএনপির নেতৃবৃন্দ
এদিকে হারুনুর রশিদ এলাকায় আসছেন; এমন খবরে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে ছনুয়া ইউনিয়ন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এমনকি ছাত্র-জনতা এবং জুলাই যোদ্ধারা ক্ষোভে ফুঁসছেন। তারা হারুনকে যেকোনো মূল্যে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন।
1019 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা