নিজস্ব প্রতিবেদক:
যোগদানের মাত্র ৫ মাসের মাথায় বদলি করা হয়েছে বাঁশখালী থানার ওসি মো. খালেদ সাইফুল্লাহকে।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।
চট্টগ্রাম রেঞ্জ দপ্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল হককে বাঁশখালীতে পদায়ন করা হয়েছে। অপরদিকে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. খালেদ সাইফুল্লাহকে চট্টগ্রাম রেঞ্জ দপ্তরে বদলি করা হয়েছে।
৫ মাসে আ.লীগ ছিল জামাই আদরে
অভিযোগ আছে, ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর বাঁশখালী থানার ওসি হিসেবে যোগদান করেন মো. খালেদ সাইফুল্লাহ। তার যোগদানের পর থেকে নিষিদ্ধ সংগঠন আ. লীগের লোকজনের বিরুদ্ধে কোনও অভিযান চোখে পড়েনি। যার ফলশ্রুতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্যরা বাঁশখালী সমুদ্র সৈকতের বাহারছড়া পয়েন্টে রমজান মাসে প্রতিদিন শোডাউন করেন। বাঁশখালীর প্রতিটি ইউনিয়নে ছাত্রলীগের কার্যক্রম ছিল চোখে পড়ার মতো।
বাণীগ্রাম বাজারের মিছিল দেশব্যাপী আলোচিত
গত ১০ এপ্রিল সাধনপুর ইউনিয়নের বাণীগ্রাম বাজার এলাকায় পিএবি সড়কে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল হয়। মিছিলটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। দুই মিনিটের এ ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন তরুণ ও যুবক শেখ মুজিবুর রহমান, এ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। এরপর তাঁরা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান। পরে তাঁরা সড়ক থেকে সরে যান।
বেড়ে যায় গরু চুরি, অবনতি ঘটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির
গত কয়েক মাসে বাঁশখালীতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে গরু চুরি। এমতাবস্থায় প্রান্তিক কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, গরু চুরি, মাদক কারবার বেড়ে গেলেও ওসির পদক্ষেপ সন্তোষজনক ছিল না।
বিতর্ক ছিল সাইফুল্লাহর নিত্যসঙ্গী
গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে বাঁশখালীতে পুলিশ হেফাজত থেকে হাতকড়াসহ আওয়ামী লীগ নেতা জিয়াউল হক চৌধুরী (৪৫) পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনার ৪ মাস পার হলেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এমনকি পুলিশের হাত থেকে আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে কোনো মামলাও হয়নি।
গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে খানখানাবাদ ইউনিয়নের কদমরসুল এলাকার বটতলী বাজারে পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যান জিয়াউল। তিনি খানখানাবাদ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি এবং বাঁশখালী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক।
সরেজমিনে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর জিয়াউলের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা হয়। গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মজনু মিয়ার নেতৃত্বে একদল পুলিশ বটতলী বাজারে অভিযান চালায়। এ সময় একটি চায়ের দোকান থেকে জিয়াউলকে গ্রেপ্তার করে হাতকড়া পরানো হয়। কিন্তু পুলিশের গাড়িতে তোলার সময় তার অনুসারীরা জড়ো হয়ে হট্টগোল সৃষ্টি করে এবং পুলিশের ওপর চড়াও হয়ে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
ঘটনার ৪ মাস অতিবাহিত হলেও আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় এবং ছিনিয়ে নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয় সচেতন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দেওয়া এবং আসামি ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল্লাহ খালেদ বিস্ময়কর মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “যারা জিয়াউলকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে, তারা সবাই মহিলা। এখন তাদেরকে কীভাবে গ্রেপ্তার করব? এ ঘটনায় মামলা হয়নি। কাউকেও স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা যায়নি।”
অথচ ঘটনার দিন ওসি সাইফুল্লাহ খালেদ জানিয়েছিলেন, আসামিকে পুনরায় গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে এবং যারা পুলিশের কাজে বাধা দিয়েছে তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু দীর্ঘ ৪ মাসেও তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
পলাতক জিয়াউল হক চৌধুরী খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুবার চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে তিনি এলাকায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি পলাতক থাকলেও তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
কে এই নতুন ওসি রবিউল হক?
বাঁশখালী থানার ওসি মো. খালেদ সাইফুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হওয়া রবিউল হক বিগত সময়ে সংসদ নির্বাচনের সময় শরীয়তপুরের ডামুড্ডা থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনকালে তিনি চাঁদপুর জেলায় পরপর চারবার শ্রেষ্ঠ ওসি হিসেবে নির্বাচিত হন।
রবিউল হক ২০১৬ সালে হাটহাজারী থানার এসআই থাকাকালীন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সময় চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনিকে অস্ত্রসহ ভোটকেন্দ্র থেকে গ্রেপ্তার করেন এবং ওই মামলার বাদী ছিলেন তিনি নিজেই।
এছাড়া, ২০২১ সালে কোম্পানীগঞ্জে ওসি (তদন্ত) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই মির্জা কাদেরকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে প্রহার করেন।