মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী>> বাঁশখালীতে শিক্ষার প্রতিযোগিতায় এবার কলেজের চেয়ে এগিয়ে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষার ফলাফলে এমন চিত্র উঠে এসেছে। পাসের হার, উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর অনুপাত কিংবা সামগ্রিক ফলাফল-প্রায় প্রতিটি সূচকেই কলেজের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে বাঁশখালীর মাদ্রাসাগুলো।
বাঁশখালী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে প্রাপ্ত ফলাফল শিট বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাঁশখালীর সাতটি কলেজের সম্মিলিত পাসের হার ৪০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। বিপরীতে ১১টি মাদ্রাসার সম্মিলিত পাসের হার ৫৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে কলেজের চেয়ে ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে মাদ্রাসা। জিপিএ-৫ অর্জনের সংখ্যায়ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।
কলেজের ফলাফলে শীর্ষে মাস্টার নজির আহমদ ডিগ্রি কলেজ
এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে বাঁশখালীর সাতটি কলেজে দেখা গেছে মিশ্র চিত্র। পাসের হারে শীর্ষস্থান অর্জন করেছে মাস্টার নজির আহমদ ডিগ্রি কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির ২৮৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১৮১ জন। পাসের হার ৬৩ দশমিক ০৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন দুজন।
অন্যদিকে মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে সরকারি আলাওল ডিগ্রি কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির ৫৩৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৭৪ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাসের হার ৫১ দশমিক ১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন দুজন।
এ ছাড়া বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজের ২৬৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮৫ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাসের হার ৩১ দশমিক ৮৪ শতাংশ। পশ্চিম বাঁশখালী উপকূলীয় ডিগ্রি কলেজের ৩৩৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৯০ জন। পাসের হার ২৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
বাঁশখালী গার্লস ডিগ্রি কলেজের ২৩১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৫২ জন। পাসের হার ২২ দশমিক ৫১ শতাংশ। হাজীগাঁও বরুমছড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৩ জনের মধ্যে তিনজন উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাসের হার ২৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। আর পশ্চিম বাঁশখালী উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের ২৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র তিনজন। পাসের হার ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ।
সব মিলিয়ে সাতটি কলেজে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ছিলেন ১ হাজার ৭১৫ জন। পরীক্ষায় অংশ নেন ১ হাজার ৬৯৬ জন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬৮৮ জন। অনুপস্থিত ছিলেন ১৯ জন। সম্মিলিত পাসের হার ৪০ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
আলিমে পাসের হারে শীর্ষে চাঁদপুর, সংখ্যায় জলদী হোসাইনিয়া
অন্যদিকে আলিম পরীক্ষার ফলাফলে বাঁশখালীর ১১টি মাদ্রাসার মধ্যে পাসের হারে প্রথম হয়েছে চাঁদপুর কিউ.এইচ.আর.ডি.ইউ. আলিম মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটির ১৬ জন অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ১২ জন। পাসের হার ৭৫ শতাংশ।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রঙ্গিয়াঘোনা মনছুরিয়া ফাজিল মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটির ৬১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৩৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাসের হার ৬০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন দুজন। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আহমদিয়া ডলম পীর (র.) আলিম মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটির ৩১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাসের হার ৫৮ দশমিক ০৬ শতাংশ।
চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে জলদী হোসাইনিয়া কামিল মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটির ১০২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাসের হার ৫৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন দুজন। পঞ্চম অবস্থানে থাকা পুকুরিয়া আনছারুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসার ৪৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। পাসের হার ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন একজন।
এ ছাড়া শেখেরখীল দারুচ্ছালাম আদর্শ আলিম মাদ্রাসার ৫১ জনের মধ্যে ২৮ জন, পালেগ্রাম হাকিম মিয়া শাহ্ আলিম মাদ্রাসার ৪৪ জনের মধ্যে ২২ জন, পুঁইছড়ি ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার ৯৫ জনের মধ্যে ৪৬ জন, যাতানুরাইন ফাজিল মাদ্রাসার ২৫ জনের মধ্যে ১১ জন, বাঁশখালী হামেদিয়া রহিমা ফাজিল মাদ্রাসার ২১ জনের মধ্যে নয়জন এবং পশ্চিম বাঁশখালী গণ্ডামারা ফাজিল মাদ্রাসার ২৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে নয়জন উত্তীর্ণ হয়েছেন।
উত্তীর্ণের সংখ্যায় জলদী হোসাইনিয়া, জিপিএ-৫-এ তিন মাদ্রাসার যৌথ সাফল্য
পাসের হারে চাঁদপুরের মাদ্রাসা এগিয়ে থাকলেও মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে জলদী হোসাইনিয়া কামিল মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটির ৫৮ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছেন, যা ১১টি মাদ্রাসার মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর প্রায় ২০ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পুঁইছড়ি ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠানটি থেকে পাস করেছেন ৪৬ জন। তৃতীয় রঙ্গিয়াঘোনা মনছুরিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ৩৭ জন এবং চতুর্থ শেখেরখীল দারুচ্ছালাম আদর্শ আলিম মাদ্রাসা থেকে ২৮ জন উত্তীর্ণ হয়েছেন। পঞ্চম পুকুরিয়া আনছারুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসা থেকে ২৭ জন এবং ষষ্ঠ পালেগ্রাম হাকিম মিয়া শাহ্ আলিম মাদ্রাসা থেকে পাস করেছেন ২২ জন।
জিপিএ-৫ অর্জনের দিক থেকেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে মাদ্রাসাগুলো। জলদী হোসাইনিয়া কামিল মাদ্রাসা, পুঁইছড়ি ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা ও রঙ্গিয়াঘোনা মনছুরিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে দুজন করে মোট ছয়জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এ ছাড়া পুকুরিয়া আনছারুল উলুম ফাজিল মাদ্রাসা ও শেখেরখীল দারুচ্ছালাম আদর্শ আলিম মাদ্রাসা থেকে একজন করে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন।
সব মিলিয়ে ১১টি মাদ্রাসায় নিবন্ধিত পরীক্ষার্থী ছিলেন ৫৪৪ জন। পরীক্ষায় অংশ নেন ৫১৯ জন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ২৭৭ জন। অকৃতকার্য হয়েছেন ২৪২ জন এবং অনুপস্থিত ছিলেন ২৫ জন। সম্মিলিত পাসের হার ৫৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন আটজন।
পরিসংখ্যানে এগিয়ে মাদ্রাসা, ব্যবধান কোথায়?
দুই শিক্ষাধারার ফলাফল পাশাপাশি রাখলে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের এগিয়ে থাকার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাতটি কলেজে ১ হাজার ৬৯৬ জন অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছেন ৬৮৮ জন। বিপরীতে ১১টি মাদ্রাসায় ৫১৯ জন অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ২৭৭ জন।
সংখ্যার হিসাবে কলেজে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী বেশি হলেও পাসের হারে এগিয়ে মাদ্রাসা। কলেজের ৪০ দশমিক ৫৭ শতাংশের বিপরীতে মাদ্রাসার পাসের হার ৫৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ দুই শিক্ষাধারার মধ্যে পাসের হারের ব্যবধান ১২ দশমিক ৮০ শতাংশ পয়েন্ট। আবার কলেজগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার ৬৩ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ। মাদ্রাসাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ এবং সর্বনিম্ন ৩৬ শতাংশ। উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানভেদে ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলেই সাফল্যের হার বেশি হবে; এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরং তুলনামূলক কম পরীক্ষার্থী নিয়েও ভালো ফলাফল করেছে বেশ কয়েকটি মাদ্রাসা। আবার বেশি পরীক্ষার্থী নিয়ে উত্তীর্ণের সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে সরকারি আলাওল কলেজ ও জলদী হোসাইনিয়া কামিল মাদ্রাসা।’