☰

বাঁশখালীর ৯০ ভাগ বাড়িঘর এখনও পানির নিচে, শুক্রবার হলেও জুমার আয়োজন ছিল না অর্ধশতাধিক মসজিদে

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
বাঁশখালীর ৯০ ভাগ বাড়িঘর এখনও পানির নিচে, শুক্রবার হলেও জুমার আয়োজন ছিল না অর্ধশতাধিক মসজিদে মধুখালী আমজাদিয়া এজাহারুল উলুম বালক-বালিকা মাদ্রাসায় এখনও কোমর সমান পানি— ছবি বাঁশখালী টুডে।

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী:

স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। স্থানীয়রা জানান, বাঁশখালীর পানি নিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম উপজেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া জলকদর খালের নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে, চিংড়ি চাষের নামে প্রভাবশালী মহল স্লুইসগেট আটকে রাখায় পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পাহাড়ি ঢল আর চিংড়ি ঘেঁরের পানি আটকে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশখালীর পাকা দালান ছাড়া প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ বাড়িঘর এখন পানির নিচে। কোথাও গলা সমান, কোথাও কোমর সমান পানি। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই এখন পানির তলায়।

পাহাড়ি ঢল আর বানের পানি হঠাৎ করেই ঢুকে পড়েছে মানুষের ঘরে। প্রস্তুতির কোনো সুযোগই পাননি কেউ। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। ঘরে মজুদ না থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে শুকনো খাবারেরও। মাটির ঘর ভেঙে পড়েছে একের পর এক। ভেসে গেছে ধান-চাল ও ঘরের আসবাব। বিদ্যুৎ নেই কয়েক দিন ধরে। মোবাইলে চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগও।

বাঁশখালী-চট্টগ্রাম মূল সড়কের একাংশ ভেঙে গেছে। পুকুর ও মাছের খামার ভেসে গেছে পানিতে। হাঁস-মুরগিও হারিয়েছেন অনেকে। অসুস্থ মানুষ আর গর্ভবতী নারীদের নিয়ে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছেন পরিবারগুলো। এর মধ্যেই বঙ্গোপসাগরের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে উপকূল জুড়ে।

শেখেরখীল হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা প্রান্ত দেব বলেন, পাকা দালানের বাসিন্দারা কিছুটা নিরাপদ থাকলেও কাঁচা, টিনশেড ও মাটির ঘরগুলো পুরোপুরি ভাসছে পানিতে। পানি কমছে না। উল্টো বাড়ছে।’

ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী গ্রামের বাসিন্দা জুনাইদুল ইসলাম জানান, ‘পশ্চিম বাঁশখালীর পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম জলকদর খাল। খাল দখল হয়ে ভরাট হয়ে গেছে। স্লুইসগেটগুলোও অকার্যকর। বিভিন্ন জায়গায় মাছের ঘেরের জন্য দেওয়া বাঁধের কারণে পানি নামার পথও রুদ্ধ। এর ফলে পুরো এলাকা তলিয়ে আছে। বন্ধ হয়ে গেছে সড়কে যান চলাচল। ছনুয়ার তিন দিকে জলকদর ও পশ্চিম দিকে বঙ্গোপসাগর। এই ইউনিয়ন থেকে সহজে পানি নিষ্কাশন হওয়ার কথা। কিন্তু চিংড়ি ঘেঁরের নামে প্রভাবশালীরা স্লুইসগেট আটকে রাখায় এই অবস্থা হয়েছে।

দুর্ভোগের এমন পরিস্থিতিতেই সামনে এসেছে এক মানবিক দৃশ্য। গত বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালীর চেচুরিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়া কয়েকজনের খবর পেয়ে ছুটে যায় বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের আট সদস্যের একটি দল। গলা সমান পানি ঠেলে তারা উদ্ধার করেন আটকে পড়া পাঁচ শিশু ও আট নারীকে। পরে স্থানান্তর করা হয় স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে।

এই উদ্ধার অভিযানের একটি ২১ সেকেন্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। যেখানে দেখা যায়— এক হাতে রশি, অন্য হাতে একটি পাতিল ধরে গলা সমান পানিতে সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য। পাতিলের ভেতরেই ছিল আট মাস বয়সী এক শিশু। পাশে হাঁটতে থাকা আরেক সদস্য পাতিলের ওপর ধরে রেখেছিলেন ছাতা, যাতে বৃষ্টির পানি শিশুটির গায়ে না লাগে।

বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেছেন, আটকে থাকার খবর পেয়ে সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ চালান, আর সেই সময় বড় একটি পাতিলে করেই শিশুটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

তিন শিশুর মৃত্যু

উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নে ছড়ার পানিতে ডুবে মো. আশিক (১১) নামে এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে বাহারছড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ ইলশা এলাকার মফজল আহমদের নতুন বাড়ির সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

জানা যায়, প্রবাসী কামাল উদ্দিনের ছেলে মো. আশিক বাড়ির সামনের রাস্তার উত্তর পাশে বশির উল্লাহ মিয়াজী বাজার সড়ক সংলগ্ন ছড়ার পানিতে পড়ে যায়। বিষয়টি দেখতে পেয়ে স্থানীয় লোকজন দ্রুত তাকে উদ্ধার করে গুরুতর অবস্থায় মোশাররফ আলী মিয়ার বাজার উপকূলীয় জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহত আশিক সাঁতার জানত না। এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

এছাড়াও একই ইউনিয়নে পানিতে তলিয়ে গিয়ে মো. মিরাজ নামের ৬ বছর বয়সী আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। নিহত মিরাজ বাহারছড়া ইউনিয়নের পশ্চিম রত্নপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে।

সরল ইউনিয়নে বন্যা কবলিত একটি রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে মোছাম্মৎ তাহিন নুর (১২) নামে এক কন্যা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাহিন নুর জালিয়াঘাটা গ্রামের আবদুল করিমের মেয়ে।

বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ম্যানেজার মিজানুর রহমান বলেন, সকাল ১০ টায় তাহিন নুর নিখোঁজ হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের টিম গিয়ে মৃত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করেছে। 

অর্ধশতাধিক মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারছেন না মুসল্লিরা

বাঁশখালীর শেখেরখীল, পুঁইছড়ি, ছনুয়া, বৈলছড়ি, কাথরিয়া, বাহারছড়া ও কালীপুর ইউনিয়নের গুণাগরী গ্রামের অর্ধশতাধিক মসজিদে তিন দিন ধরে নামাজ পড়তে পারছেন না মুসল্লিরা। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত শুক্রবার এসব মসজিদে জুমার নামাজের আয়োজন হয়নি। এসব গ্রামের মুসল্লিরা কয়েক কিলোমিটার দূরের মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ আদায় করেছেন।

ছনুয়া ইউনিয়নের মধুখালী আমজাদিয়া এজাহারুল উলুম মাদ্রাসা মসজিদের নিয়মিত মুসল্লি মাওলানা মাহমুদুল হক জানান, মধুখালী আমজাদিয়া এজাহারুল উলুম মাদ্রাসা মসজিদ গলা পানিতে তলিয়ে গেছে। এই মসজিদে তিন দিন ধরে নামাজ আদায় করতে পারছেন না মুসল্লিরা। আজকে জুমার নামাজও পড়তে পারেননি কেউ।

বায়তুর রহমান জামে মসজিদের মুসল্লি সাঈয়েদুল হক বলেন, আমাদের মসজিদে এখনও কোমর সমান পানি। ৪ দিন যাবত জামাতে নামাজ আদায় করতে পারিনি। আজ শুক্রবার জুমার নামাজের আয়োজনও হয়নি।

জানা গেছে, বন্যা কবলিত এসব মসজিদে কোনোরকম আজান হলেও নামাজ আদায় করতে পারছেন না মুসল্লিরা।

ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না দক্ষিণ বাঁশখালীতে

উত্তর বাঁশখালীর গুণাগরী, বাহারছড়া, কাথরিয়া, বৈলছড়িসহ কয়েকটি ইউনিয়নে ত্রাণ পৌঁছালেও শহর থেকে দূরবর্তী হওয়ায় দক্ষিণ বাঁশখালীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। ফলে ছনুয়া, শেখেরখীল ও পুঁইছড়ি ইউনিয়নের মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে।

পুঁইছড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম পুঁইছড়ি গ্রামের বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম রকি বলেন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রেমবাজারে পর্যন্ত এসে গাড়ি নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। কারণ, সরলিয়া বাজার হয়ে পশ্চিম পুঁইছড়ি আসার একমাত্র সড়কটি এখনও পানির নিচে। তাই ছনুয়াতেও ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। এসব এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রে অনেকে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানিকপাঠান গ্রাম

চলমান বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কাথরিয়া ইউনিয়নের মানিকপাঠান গ্রামের বাসিন্দারা। এই গ্রামে ২০-২৫ টি গবাদি পশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এছাড়াও অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে।

মানিকপাঠান গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমার বাড়ির সব জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। বিক্রির জন্য রাখা ৬০০ আড়ি ধান ভিজে গেছে। বাড়িটি মাটির হওয়ায় সবকিছু মাটির সাথে মিশে গেছে। এখন দেখা যাচ্ছে ধ্বংসাবশেষ।

আসলেন জামায়াত আমির, দিলেন ত্রাণ, নিলেন খবর

সকালে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি বন্যাদুর্গত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী ও নগদ আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন।

শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রাম সফরের অংশ হিসেবে বাঁশখালীর কালীপুর ইউনিয়নের গুণাগরী গ্রামে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ নেন এবং তাদের দুর্ভোগের কথা শোনেন।

পরিদর্শন শেষে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুর্যোগের সময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো একটি মানবিক দায়িত্ব। বিপদে-আপদে অসহায় মানুষের পাশে থাকা সবার কর্তব্য। জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যাকবলিত মানুষের পাশে থাকবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সহযোগিতায় কাজ করবে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বন্যায় অনেক মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল ও সহায়-সম্পদ হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

জামায়াত আমির বলেন, জাতীয় সংসদে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিরোধীদল বিষয়টি উত্থাপন করেছে এবং সরকারের পক্ষ থেকেও ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। বন্যাদুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কাছ থেকে দেখা, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং সরকারের করণীয় বিষয়ে দাবি জানাতেই এ সফর।

পরিদর্শনের সময় তিনি হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে নেমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের প্রয়োজনের কথা শুনে প্রত্যেক পরিবারের হাতে ত্রাণসামগ্রী ও নগদ আর্থিক সহায়তা তুলে দেন। পাশাপাশি দুর্গত মানুষের পাশে থাকার আশ্বাসও দেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তিনি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং দেশের সর্বস্তরের মানুষকে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

পরিদর্শন শেষে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে শুকনো খাবার ও আর্থিক সহায়তা বিতরণ করেন। পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।

322 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা