☰

সরকারি জায়গা বিক্রির বিজ্ঞাপন দিলেন শফকত চাটগামী

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সরকারি জায়গা বিক্রির বিজ্ঞাপন দিলেন শফকত চাটগামী ‘জাগো বাঁশখালী’ নামের একটি ফেসবুক পেজে খাস জমি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেন শফকত হোসাইন চাটগামী
নিজস্ব প্রতিবেদক>>
জমি তাঁর নয়, মালিকানা সরকারের-তবু সেই জমিই বিক্রির বিজ্ঞাপন! বছরের পর বছর ধরে সরকারি জমির অংশ বিক্রির এমন বিজ্ঞাপন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাংবাদিক শফকত হোসাইন চাটগামীর বিরুদ্ধে। এবার কয়েক গণ্ডা নয়, লিজ নেওয়া সরকারি জমিতে গড়ে তোলা সেমিপাকা বাড়িসহ পুরো জায়গা বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়েছেন তিনি। চাওয়া হচ্ছে ২৫ লাখ টাকা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের বসতি আর সরকারি জমির মালিকানার প্রশ্নে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত বাস্তবতা-যেখানে সরকারের জমিতে বসতি, আর সেই বসতিই এখন বিক্রির বিজ্ঞাপনে!

ঘূর্ণিঝড়ের পর নতুন ঠিকানা

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯১ সালের মহাপ্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রাম ছেড়ে বাঁশখালী পৌরসভায় বসতি গড়েন শফকত হোসাইন চাটগামী। পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আমিরাঘোনা এলাকায় আনুমানিক দুই কানি আয়তনের একটি সরকারি জমি তিনি লিজ নেন বলে জানা গেছে।

সেই জমিতেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বসতবাড়ি, মাটির মসজিদ ও মাদ্রাসা। সময়ের স্রোতে পরিত্যক্ত জমি পরিণত হয় বসতিতে; আর সেই বসতিই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে বিক্রির বিজ্ঞাপনে।

আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘিরে বিরোধ

চাটগামীর লিজ নেওয়া জমির পাশেই রয়েছে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৩ সালে ওই এলাকায় সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে জমি নিয়ে তৎকালীন বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে চাটগামীর বিরোধ তৈরি হয়। চাটগামীর লিজ নেওয়া  উক্ত জায়গায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করতে চেয়েছিল উপজেলা প্রশাসন।

এরপরও সরকারি জমিতে তাঁর বসতি ও জমির ব্যবহার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

কয়েক গণ্ডা থেকে এবার বাড়িসহ ২৫ লাখ!

স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর ধরে চাটগামী লিজ নেওয়া জমির একটি অংশ-প্রায় ৫ গণ্ডা-বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে আসছিলেন। বিভিন্ন ফেসবুক পেজেও এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এবার যেন সেই বিজ্ঞাপনের গল্পে নতুন মোড়।
কয়েক গণ্ডা জমি নয়; লিজ নেওয়া সরকারি জমিতে নির্মিত সেমিপাকা বাড়িসহ পুরো বসতি ২৫ লাখ টাকায় বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষ্য, দীর্ঘদিন সরকারি জমিতে বসবাস করলেও চাটগামী নাকি স্থায়ীভাবে নিজের নামে একটি ভূমি চান। সেই উদ্দেশ্যেই সরকারি জমি ও বাড়ি বিক্রি করে নিজস্ব জমি কেনার চেষ্টা করছেন—এমন কথাও স্থানীয়ভাবে শোনা যাচ্ছে।

২৫ লাখ টাকায় জমিসহ বাড়ি!

সম্প্রতি ‘জাগো বাঁশখালী’ নামের একটি ফেসবুক পেজে কনটেন্ট ক্রিয়েটর আবু ছিদ্দিকের মাধ্যমে ওই জমি ও বাড়ি নিয়ে একটি ভিডিও বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় বলে জানা গেছে।

ভিডিওতে জমি ও বাড়ির নানা দিক তুলে ধরা হলেও-জমিটি ব্যক্তিমালিকানাধীন কি না, বৈধ খতিয়ানভুক্ত কি না কিংবা বিক্রির আইনগত অধিকার বিজ্ঞাপনদাতার রয়েছে কি না-এসব বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সরকারি জমি হলে বিক্রির অধিকার কার?

খোঁজ নিয়ে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চাটগামীর বসতি স্থাপন করা জমিটি সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত।
সাধারণভাবে, খাস জমি বলতে সরকারের মালিকানাধীন বা সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন জমিকে বোঝানো হয়। এ ধরনের জমি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমির মতো ইচ্ছেমতো কেনাবেচার বিষয় নয়। সরকার নির্ধারিত আইন, বিধি ও প্রক্রিয়া অনুসারেই এর বন্দোবস্ত, লিজ বা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে-লিজ নেওয়া সরকারি জমি কি ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো বিক্রি করা যায়?

আর যদি জমিটি সত্যিই ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে ২৫ লাখ টাকায় সেই জমি ও তার ওপর নির্মিত বাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়ার আইনগত ভিত্তিই বা কী?

বাঁশখালীর পাহাড়ে চলছে খাস জমির ‘বেচাকেনা’

স্থানীয়দের অভিযোগ, বাঁশখালীর পাহাড়ি এলাকায় সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জমি গোপনে বিক্রির একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। কোথাও কোথাও প্রতি গণ্ডা জমির দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করে এসব জমি হাতবদলের অভিযোগও রয়েছে।

কিন্তু স্ট্যাম্পের কাগজ কি সরকারি জমির মালিকানা বদলে দিতে পারে? যে জমির মালিক রাষ্ট্র, সেখানে কয়েকটি স্বাক্ষর আর একটি স্ট্যাম্পের কাগজ দিয়ে কি তৈরি হয় ব্যক্তিমালিকানা? নাকি এসব কেবল কাগজের আড়ালে সরকারি সম্পদ দখল ও হাতবদলের এক অভিনব কৌশল?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন প্রশাসনের সরেজমিন তদন্ত। একই সঙ্গে জমিটির খতিয়ান, লিজের শর্ত, দখলের বৈধতা এবং বিক্রির বিজ্ঞাপনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সরকারি জমি যদি রাষ্ট্রের সম্পদ হয়, তবে সেই সম্পদের ক্রেতা-বিক্রেতা কারা—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সময়ের দাবি।
394 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা