নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে>> চাঞ্চল্যকর ফাতেমা ধর্ষণ মামলার আসামি নেজাম উদ্দিন ওরফে নেজাম মাঝিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে রবিবার দুপুরে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে তা নামঞ্জুর হয়। এ খবরে শেখেরখীলে আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণ ও উল্লাস করেন স্থানীয়রা। তবে আনন্দের সেই আবহের মধ্যেই হামলার অভিযোগে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে এলাকায়।
রবিবার রাত ৮টার দিকে শেখেরখীল মৌলভীবাজারে স্থানীয়দের উদ্যোগে আনন্দ মিছিল বের করা হয়। মিছিলজুড়ে ছিল উচ্ছ্বাস, মিষ্টি বিতরণ আর দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ সময় নেজাম মাঝির লোকজন মিছিলে হামলা চালান। এতে সামাজিক সংগঠন মায়া সংঘের সভাপতি গিয়াস আকবর গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।
ফাতেমার মৃত্যুর পর নতুন মোড়
চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি। শেখেরখীলের একটি বাড়িতে ১৩ বছর বয়সী কিশোরী ফাতেমার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল পুরো এলাকাকে। বাঁশখালী থানা পুলিশ সকালে নিজ বাড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে। সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকেই ফাতেমার পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন, অভিযোগ আর বিচারপ্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা দানা বাঁধে।
ফাতেমা শেখেরখীল ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাহামনিখীল এলাকার বাসিন্দা মো. এরফানুল হকের মেয়ে। তার মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের অভিযোগ, ধর্ষণ মামলার আসামির পিতৃত্ব অস্বীকার, সামাজিকভাবে একঘরে করে রাখা এবং মামলা প্রত্যাহারে চাপ ও হুমকির মতো ঘটনা তাকে গভীর মানসিক সংকটে ফেলেছিল।
অভিযোগের সূত্রপাত যেভাবে
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছনুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চেমটখালী এলাকার মৃত ছৈয়দ আহমদের ছেলে নেজাম উদ্দিন শেখেরখীল ইউনিয়নের বাংলাখাল ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তাঁর ভবনে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতেন ফাতেমার বড় বোন ও দুলাভাই। সেই সূত্রে প্রায় দুই বছর আগে বোনের সন্তানকে দেখাশোনার জন্য সেখানে থাকতে শুরু করে ফাতেমা।
পরিবারের অভিযোগ, প্রায় এক বছর আগে নেজাম উদ্দিন ফাতেমার সঙ্গে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে গর্ভবতী হলে ফাতেমা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করে। বর্তমানে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা মামলাটি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), চট্টগ্রাম ইউনিটে তদন্তাধীন রয়েছে। পাশাপাশি সন্তানের ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়াও চলমান।
সন্তান জন্ম, পিতৃত্ব অস্বীকার
নিহতের বোন জুবায়দা নাহার রিকুর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ জানুয়ারি ফাতেমা একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি সন্তানের পিতৃত্ব অস্বীকার করেন বলে অভিযোগ পরিবারের। তাদের দাবি, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফাতেমাকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয় এবং মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে নেজাম উদ্দিনকে একমাত্র আসামি করে মামলা দায়ের করেন ফাতেমার বোন জুবায়দা নাহার রিকু। এক মাস বয়সী কন্যাসন্তানকে রেখে ফাতেমার এমন করুণ পরিণতি পরিবারকে শোকাহত করে তোলে। স্বজনদের ধারণা, সামাজিক চাপ ও মানসিক বিপর্যয় তার মৃত্যুর পেছনে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলই হবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিচারের প্রত্যাশায় শেখেরখীলবাসী
একটি কিশোরীর মৃত্যু, ধর্ষণের অভিযোগ, নবজাতকের পিতৃত্ব নিয়ে বিরোধ এবং মামলা প্রত্যাহারে চাপের অভিযোগ-সব মিলিয়ে ফাতেমার ঘটনাটি শেখেরখীলের মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। নেজাম মাঝিকে কারাগারে পাঠানোর খবরে স্থানীয়দের আনন্দ মিছিল সেই ক্ষত থেকে জন্ম নেওয়া বিচারপ্রত্যাশারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে কারাগারে পাঠানোর আদেশ কোনো অভিযোগের চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি নয়। মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং দোষ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তিই পারে ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণ করতে।
ফাতেমার রেখে যাওয়া ছোট্ট কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ, পরিবারের দীর্ঘশ্বাস আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষা-সবকিছু মিলিয়ে এই ঘটনা আবারও সামনে এনেছে গ্রামীণ সমাজে নারীর নিরাপত্তা, সামাজিক কলঙ্ক এবং প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার পাওয়ার কঠিন বাস্তবতাকে।
শেখেরখীলের মানুষের প্রত্যাশা, আবেগ-উত্তেজনার ঊর্ধ্বে উঠে ঘটনার প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে, অপরাধ প্রমাণিত হলে নিশ্চিত হবে আইনগত বিচার, আর কোনো ফাতেমাকে যেন সামাজিক চাপ ও অবহেলার নির্মম ভার একা বহন করতে না হয়।