মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী:
প্রশাসনিক আদেশে বদলি হয় পদ, বদলে যায় কর্মস্থল। কিন্তু কিছু মানুষ চলে যাওয়ার আগে রেখে যান এমন কিছু স্মৃতি, যা দীর্ঘদিন ধরে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর সানী আকনের বিদায়ের সংবাদ যেন তেমনই এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে পুরো উপজেলায়।
গত ৫ জুলাই তাঁর বদলির আদেশ জারি হয়। নতুন কর্মস্থল চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা—সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন তিনি। স্থানীয়দের ভাষায়, একজন কর্মঠ, সাহসী ও জনবান্ধব কর্মকর্তাকে হারাতে যাচ্ছে বাঁশখালী।
২০২৫ সালের ২০ আগস্ট বাঁশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রশাসনের প্রচলিত গণ্ডি পেরিয়ে মাঠে নেমে কাজ করেছেন মো. ওমর সানী আকন। দিনের আলো কিংবা গভীর রাত—যেখানেই অন্যায়, সেখানেই ছিল তাঁর উপস্থিতি। মাদক, জুয়া, অবৈধ বালু উত্তোলন, ভূমিদস্যুতা, পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড ও নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে একের পর এক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
মাদক বিক্রি কিংবা সেবনের খবর পেলেই দ্রুত অভিযান পরিচালনা করতেন তিনি। ফলে অপরাধীদের কাছে ছিলেন আতঙ্কের নাম, আর সাধারণ মানুষের কাছে ছিলেন ভরসার ঠিকানা।
তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্ব কেবল আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধ ছিল না। মাদকাসক্ত সন্তানের নির্যাতনে অসহায় বাবা-মায়ের কান্নার আবেদনেও তিনি সাড়া দিয়েছেন। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ, অমায়িক আচরণ, সহজপ্রাপ্য নাগরিকসেবা এবং দৃঢ় প্রশাসনিক অবস্থানের কারণে অল্প সময়েই তিনি সাধারণ মানুষ, তরুণ সমাজ ও সচেতন নাগরিকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
প্রশাসনিক সূত্র জানায়, গত অর্থবছরে তিনি সর্বোচ্চ ৩১০টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এই সাফল্যের ভিত্তিতেই চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় তাঁর নাম ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের এক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
তাঁর পরিচালিত ৩১০টি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৬২ লাখ ৭১ হাজার টাকা অর্থদণ্ড আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধে ১৪০ জনকে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, স্থানীয় সরকার আইন, সড়ক পরিবহন আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ঔষধ ও কসমেটিকস আইন এবং বাংলাদেশ হোটেল ও রেস্তোরাঁ আইনসহ বিভিন্ন আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন।
ভূমি প্রশাসনেও রেখে গেছেন অনন্য সাফল্যের স্বাক্ষর। সরকার নির্ধারিত নামজারি নিষ্পত্তির গড় সময় ২৮ দিন হলেও তাঁর সময়ে বাঁশখালী উপজেলা ভূমি অফিসে গড় নিষ্পত্তির সময় ছিল মাত্র ২০ দিন। দায়িত্ব পালনকালে প্রায় সাড়ে নয় হাজার নামজারি অনুমোদন এবং ১ হাজার ২৪৫টি বিবিধ (মিস) মামলার শুনানি সম্পন্ন হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ে তিনি গড়েছেন নতুন রেকর্ড। তাঁর সময়ে আদায়ের হার ছিল ১৯২ শতাংশ, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণ এবং চট্টগ্রাম জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ।
২০২২ সালের ডিসেম্বরে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে সরকারি চাকরিজীবন শুরু করেন মো. ওমর সানী আকন। এরপর বাঁশখালীতে দায়িত্ব পালন করে তিনি কর্মনিষ্ঠা, সততা ও সাহসিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
তাঁর বদলির খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ শুভকামনা জানাচ্ছেন। কেউ লিখছেন, "এমন কর্মকর্তা বারবার আসে না।" আবার কেউ বলছেন, "বাঁশখালী একজন সৎ ও নির্ভীক অভিভাবককে হারালো।"
প্রশাসনের নিয়মে বদলি অনিবার্য। তবুও কিছু বিদায় থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে। মো. ওমর সানী আকনের বিদায়ও তেমনই এক বিদায়—যেখানে দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হলেও মানুষের ভালোবাসার খাতায় তাঁর নাম অমলিন থেকে যাবে বহুদিন।