☰

বাঁশখালীতে সড়কে ঝরল প্রাণ, অথচ গুজবের চাকার নিচে পিষ্ট হলো সত্য

সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬
বাঁশখালীতে সড়কে ঝরল প্রাণ, অথচ গুজবের চাকার নিচে পিষ্ট হলো সত্য নিহত মো. জুয়েল রানা
নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে:
রোববারের সকালটি ছিল আর দশটি দিনের মতোই। জীবিকার টানে দোকানের উদ্দেশে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন বাঁশখালীর তরুণ ব্যবসায়ী মো. জুয়েল রানা। কে জানত, সেই যাত্রাই হবে জীবনের শেষ যাত্রা!

সকাল আনুমানিক ১১টা ৪০ মিনিটে চট্টগ্রাম-পেকুয়া আঞ্চলিক সড়কের বাঁশখালীর শীলকূপ ফায়ার সার্ভিস স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া ওভারটেকিংয়ের পর ঘটে ভয়াবহ সংঘর্ষ। মুহূর্তেই রক্তে রঞ্জিত হয় পথ, থেমে যায় একটি তরতাজা প্রাণের স্পন্দন। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক জুয়েল রানাকে মৃত ঘোষণা করেন। একই ঘটনায় আহত হন রেজাউল করিম, যিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন।

কিন্তু নির্মম বাস্তবতার চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল কিছু দায়িত্বহীন প্রচার। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানার আগেই বাঁশখালীর কয়েকজন মোবাইল সাংবাদিক পরিচালিত ফেসবুক পেইজে ছড়িয়ে দেওয়া হলো বিভ্রান্তিকর তথ্য। সেখানে দাবি করা হয়, ব্রাজিলের পরাজয়ের মাত্র ১৫ মিনিট পর জুয়েলের মৃত্যু হয়েছে—এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয় যেন সড়ক দুর্ঘটনায় নয়, ফুটবল দলের হারের শোকে তার মৃত্যু হয়েছে!

একটি পরিবারের শোক তখনও ভাষা খুঁজে পায়নি, অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের ঢেউ সত্যকে আড়াল করে দিতে শুরু করে।

নিহতের ভাই আরাফাত হোসেন ক্ষোভ আর বেদনা নিয়ে জানান, দুর্ঘটনার সময় একটি লোহার রড জুয়েলের বুক ভেদ করে, আর সেটিই তার মৃত্যুর প্রধান কারণ। অথচ কিছু ফেসবুক পেইজ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে তাদের পরিবারকে আরও বিপর্যস্ত করেছে। ‘দেখো বাঁশখালী’ নামের একটি ফেসবুক পেইজ থেকে নেইমার হেরে যাওয়ার কারণে মৃত্যু হয়েছে বলে প্রথম ভাইরাল করা হয়।  তিনি বলেন, “এটি নিছক গুজব। আমার ভাই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে, ব্রাজিলের হারে নয়।”

জুয়েল রানা ছিলেন বাঁশখালী পৌরসভার লতিফ মার্কেটের একজন কাপড় ব্যবসায়ী। প্রতিদিনের মতোই জীবিকার সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আর ঘরে ফেরা হলো না।

মৃত্যুর পর তার একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস নতুন করে নাড়া দিয়েছে সবাইকে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন—“মানুষের পরিবর্তন মৃত্যুর মতোই, যেকোনো সময় হতে পারে।” কে জানত, এই কথাগুলোই অল্প সময়ের মধ্যে তার নিজের জীবনকেই এত গভীরভাবে প্রতিফলিত করবে!

এ ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—সাংবাদিকতার প্রথম শর্ত সত্য, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিযোগিতার নামে গুজব ছড়িয়ে মানুষের শোককে উপহাসে পরিণত করা কোনোভাবেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। একটি প্রাণ হারিয়েছে সড়কে, কিন্তু সত্য যেন আরেকবার হারিয়ে গেল কিছু দায়িত্বহীন প্রচারের ভিড়ে।

বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক জানান, দুর্ঘটনার পর ঘাতক সিএনজিটি স্থানীয় জনতা আটক করে। পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

জুয়েল রানার অকাল প্রয়াণে শোকস্তব্ধ পরিবার, স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজন। তাদের একটাই প্রত্যাশা—গুজব নয়, সত্যই যেন মানুষের কাছে পৌঁছায়।
1222 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা