নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে:
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ পরিবারের মধ্যে নতুন ঘরের চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছেন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও স্থানীয় বিএনপি নেতারা। তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাননি স্থানীয় সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁশখালীর এমপি মাওলানা জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘‘তারা মুখে বলে সবার আগে বাংলাদেশ। সেটি তো কথা আর কাজে মিল পাচ্ছি না। কিন্তু এখন তো দেখতেছি সবার আগে বিএনপি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই একজন এমপি। আরেকজন এমপির সম্মান তিনি চাননি। এটি দুঃখজনক। একজন পরাজিত প্রার্থীকে সম্মানিত করেছেন রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় করে। এখানে তো জনগণের অর্থের মূল্যায়ন হয়নি।’’
রোববার বাঁশখালীর সমুদ্রতীরে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম এবং সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। তবে তাঁদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে মাওলানা জহিরুল ইসলাম বলেন, বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না পাওয়াকে তিনি মূল বিষয় হিসেবে দেখছেন না; বরং বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের পুনর্বাসন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা না আসায় তিনি উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, বাঁশখালীতে বন্যায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ গৃহহীন হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০০ পরিবারকে ঘর দেওয়া হয়েছে। বাকি ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে কী উদ্যোগ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।
এমপি বলেন, “১০০ জন মানুষ উপকৃত হলে বাকি সাড়ে তিন হাজার মানুষ কোথায় যাবে?” তাঁর দাবি, পর্যায়ক্রমে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দ বা কোনো কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হলে তা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতো।
মাওলানা জহিরুল ইসলাম আরও বলেন, তিনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি ডিও লেটার দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে তো মানুষ কিছু আশা করে। কিন্তু স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। আমি ডিওলেটার দিয়েছি। ১০০ জন মানুষকে নিম্নমানের ঘর দিয়ে মানুষের সাথে প্রতারণা না করে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে তিন হাজার মানুষকে নিয়ে কি করা যায় সেটির একটা স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া উচিত ছিল। ১০০ জন মানুষ উপকৃত হলে বাকি সাড়ে ৩ হাজার মানুষ কোথায় যাবে?’’
ঘরের মান নিয়ে প্রশ্ন
১০০টি ঘর নির্মাণে বরাদ্দ অর্থের ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম। তাঁর দাবি, সরকারি ৮ বান টিন দেওয়ার পরও প্রতিটি ঘরে ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা করে কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের ১০০টি ঘর করে ফেলেছে। জাতিকে স্পষ্ট হিসাব দিতে হবে। এগুলো তো বন্যার্ত মানুষের রিলিফের টাকা।”
বক্তব্য দিতে না পারলেও হতাশ নয় জানিয়ে তিনি বলেন, “বক্তব্য দিতে পারিনি সেটি বড় কথা নয়, প্রধানমন্ত্রীকে কেন্দ্র করে কোটি টাকা রাষ্ট্রের অর্থ খরচ হলো। কিন্তু গৃহহারা বানভাসি মানুষ কী পেল সেটি দেখার বিষয়। এটি হচ্ছে আমার বড় কথা। আশাকরি আমাদেরকে বরাদ্দ দেবে বা সিদ্ধান্ত দিবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে কিছু পাওয়া যায়নি এটিই চিন্তা করতেছি আর কি। এটি উদ্বেগের বিষয়। বক্তব্য দিতে দেয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “এটি তাদের রাজনৈতিক শিষ্টাচার। রাষ্ট্রের টাকা দিয়ে পরাজিত প্রার্থীর মূল্যায়ন করেছে। নির্বাচিত প্রার্থীর অবমূল্যায়ন। কিন্তু বানভাসি সাড়ে ৩ হাজার মানুষও আশ্বাস পায়নি। অপরদিকে যে ১০০ জনকে দেওয়া হয়েছে, সে ঘরগুলো স্বচ্ছতার সাথে নির্মিত হয়েছে কিনা, এটি হচ্ছে বিবেচ্য বিষয়।”
তবে ঘর নির্মাণে মোট কত টাকা বরাদ্দ ছিল, প্রতিটি ঘরের ব্যয়ের সরকারি হিসাব কী এবং নির্মাণকাজের মান নিয়ে কোনো সরকারি পরিদর্শন বা মূল্যায়ন হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে অনুষ্ঠানে বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুষ্ঠানে কারা বক্তব্য দিয়েছেন
অনুষ্ঠানে মঞ্চে বক্তব্য দেওয়া স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাঁশখালী পৌরসভার সাবেক মেয়র কামরুল ইসলাম হোসাইনী ও পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক রাসেল ইকবাল মিয়া।
স্থানীয় জামায়াত নেতাদের কয়েকজন অবশ্য সংসদ সদস্যকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার সমালোচনা করেছেন। তাঁদের দাবি, সরকারি অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল।
তবে সরকারি অনুষ্ঠানের বক্তব্যের তালিকা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার কারণ কী- এ বিষয়ে আয়োজক বা প্রশাসনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০০ পরিবারের মধ্যে নতুন ঘরের চাবি হস্তান্তর করেন। বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অন্য পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকার কী উদ্যোগ নেবে, সেটিই এখন স্থানীয়ভাবে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: একুশে পত্রিকা