☰

বাঁশখালীতে ঘটে যেতে পারে আরেক অপ্রতীম কাণ্ড!

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাঁশখালীতে ঘটে যেতে পারে আরেক অপ্রতীম কাণ্ড! রাতের অন্ধকারে শৈশব: সন্তান বিপথে গেলে দায় কার?
বাঁশখালীর বাস্তব চিত্রের নির্মম সত্যতা

উজ্জ্বল বিশ্বাস>>
শিশু-কিশোরের অকাল পরিণতি কিংবা হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক খবর যখন আমাদের চোখের সামনে আসে, তখন বিবেক যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। কোনো শিশুর নির্মম মৃত্যু আমাদের মনে প্রথমেই প্রশ্ন তোলে-এর জন্য দায়ী কে? রাষ্ট্র, সমাজ, নাকি অভিভাবক?

প্রতিটি ঘটনার দায় এককভাবে কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ নয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সমাজের দায়িত্ব রয়েছে সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা। তবে সন্তানের প্রতিদিনের চলাফেরা, সঙ্গ, সময় ও নিরাপত্তার বিষয়ে অভিভাবকের দায়িত্বও অনস্বীকার্য। বিশেষ করে অল্পবয়সী সন্তান গভীর রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকলে সেই দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।

রাত ১০টা ৪০ মিনিটে বাঁশখালীর একটি দৃশ্য

ঘটনাটি ৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার রাতের। স্থান-বাঁশখালী উপজেলা সদরের মাছবাজার সড়কের ব্রাহ্মণপাড়ার টেক। রাত তখন প্রায় ১০টা ৪০ মিনিট। কখনো ঘন, কখনো পাতলা বৃষ্টি হচ্ছিল।
একটি অনুষ্ঠান শেষে একা হেঁটে বাড়ি ফিরছিলাম। পথেই চোখে পড়ল তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া ৭-৮ জন ছেলে-মেয়ে। সবার কাঁধে স্কুলব্যাগ। অথচ বৃষ্টির মধ্যে তারা একে অপরকে ধাক্কা দিচ্ছে, কাদা-পানি ছিটাচ্ছে, ছোট ছোট ঢিল ছুড়ছে, আবার কারও শার্ট-প্যান্ট ধরে টানাটানি করছে।

দৃশ্যটি দেখে মনে প্রশ্ন জাগল-এত রাতে এই শিশুরা এখানে কেন? কখন তারা বাড়ি ফিরবে? কখন রাতের খাবার খাবে? কখন ঘুমাবে? পরে একজন প্রাইভেট টিউটরের কাছ থেকে জানতে পারলাম, প্রাইভেট পড়া শেষে বাড়ি ফেরার সময় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। আশপাশে অভিভাবকদের উপস্থিতিও চোখে পড়ে না। সেদিন অপরিচিত শিশুদের কয়েকবার ধমক দিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরে যেতে বলেছিলাম। তারপর চলে আসি।

একই দৃশ্য আবারও

২১ সেপ্টেম্বর, সোমবার রাত ১০টা ১৫ মিনিট। এবার বৃষ্টি নেই। কিন্তু প্রায় একই দৃশ্য।
একদল শিশু-কিশোর দৌড়াদৌড়ি করছে, খেলাধুলার ছলে নানা ধরনের কাণ্ড করছে। একপর্যায়ে প্রায় ৫০ গজ দূরে বাজারের সড়কের ওপর একটি ছেলে পা পিছলে পড়ে যায়। তাকে ঘিরে অন্যরা খেলাচ্ছলে কেউ পিঠে লাথি মারছে, কেউ দুই হাত ধরে দুইদিকে টানছে। চারদিকে উল্লাস।

সবার কাঁধেই স্কুলব্যাগ। পরে স্থানীয় কয়েকজন দোকানদারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, প্রাইভেট পড়া শেষে প্রায় প্রতিরাতেই এমন দৃশ্য দেখা যায়। তখন আবারও মনে হলো-এভাবে রাতের অন্ধকারে শিশুদের চলাফেরা কি কেবল একটি স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ আছে?

সন্তানকে শিক্ষিত করার পাশাপাশি মানুষ করাও জরুরি

প্রিয় এলাকাবাসী ও অভিভাবকবৃন্দ, আমি শুধু দুই রাতের দুটি দৃশ্য তুলে ধরলাম। এর বাইরেও হয়তো আরও অনেক অপ্রকাশিত ঘটনা রয়েছে। উল্লেখিত এলাকার দোকানদারদের সঙ্গে কথা বললে সেসব ঘটনার আরও অনেক কিছু জানা যেতে পারে।
সন্তানকে লেখাপড়া শেখানো অবশ্যই জরুরি। কিন্তু শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়-সময়জ্ঞান, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তাবোধ, ভালো-মন্দের পার্থক্য এবং নৈতিক শিক্ষা দেওয়াও অভিভাবকের দায়িত্ব। গভীর রাতে প্রাইভেট পড়া শেষে ছোট ছোট শিশুদের একা কিংবা দলবেঁধে বাড়ি ফেরার বিষয়টি অভিভাবকদের নতুন করে ভাবতে হবে। খেলতে খেলতে অসাবধানতাবশত একটি দুর্ঘটনা ঘটে গেলে দায় নেবে কে? একটি দুর্ঘটনা ঘটার পর আফসোস করার চেয়ে দুর্ঘটনার আগেই সতর্ক হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্ধকার শুধু পথকে নয়, কখনো কখনো ভবিষ্যৎকেও ঢেকে দেয়

রাতের অন্ধকার সবসময় বিপদের প্রতীক নয়। কিন্তু অল্পবয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে গভীর রাতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাইরে থাকা তাদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই সন্তান কখন বাইরে যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে, কখন ফিরছে-এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা প্রয়োজন। অনেক অভিভাবক নিজের পেশাগত দায়িত্বে ব্যস্ত থাকেন। কেউ শিক্ষকতা করেন, কেউ ব্যবসা করেন, কেউ চাকরি করেন। ব্যস্ততা জীবনের বাস্তবতা। কিন্তু সন্তানের প্রতি নজরদারি ও সময় দেওয়ার বিকল্প নেই।
শিক্ষকতা মহৎ পেশা। কিন্তু নিজের সন্তান কোথায়, কার সঙ্গে, কী করছে-তার খবর রাখাও একজন অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। অর্থ-সম্পদ, শিক্ষা কিংবা সামাজিক পরিচয়ের চেয়েও একজন সুসন্তানের মূল্য অনেক বেশি।

একটি মৃত্যুর পর নয়, তার আগেই সচেতন হই

সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের কিশোর সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশবাসী ব্যথিত হয়েছেন। এমন প্রতিটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে-শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা, বন্ধুত্ব, চলাফেরা, সামাজিক পরিবেশ এবং অভিভাবকীয় নজরদারি নিয়ে আমরা কতটা সচেতন?
একটি শিশুর বিপদে পড়ার পর আমরা সবাই প্রশ্ন করি-কেন এমন হলো? কিন্তু প্রশ্নটি তার আগেই করা দরকার-

সন্তান কোথায়?
কার সঙ্গে?
কখন বাড়ি ফিরবে?
তার বন্ধুরা কারা?
সে কী করছে?

সমাজের অসংগতি দেখেও আমরা অনেক সময় নীরব থাকি। চোখ সবার বন্ধ নয়, কিন্তু অনেক সময় আমরা চোখ বন্ধ করে থাকি। আর সেই নীরবতার সুযোগেই ছোট ছোট সমস্যাগুলো কখনো বড় বিপদের রূপ নেয়। রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে, সমাজের দায়িত্ব আছে; তবে সন্তানের নিরাপত্তা ও চরিত্র গঠনের প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। তাই সন্তানকে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্যও সময় দিন।

গভীর রাতের অন্ধকারে সন্তানকে একা ছেড়ে দেওয়ার আগে একবার ভাবুন-আপনি কি জানেন, সে কোথায়? আজকের সামান্য অসচেতনতা যেন আগামী দিনের বড় কোনো অনুশোচনার কারণ না হয়।

লেখক>>
পরিচালক, গ্রাসরুটস্ চাইল্ড কেয়ার কে. জি. স্কুল।
বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।
1307 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা