☰

কক্সবাজার মডেল মসজিদে বসে হাসানকে অপহরণের পরিকল্পনা হয়

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
কক্সবাজার মডেল মসজিদে বসে হাসানকে অপহরণের পরিকল্পনা হয় আদালতে দুই আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, মূল পরিকল্পনাকারীসহ চারজন রিমান্ডে
নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে>>
দোকানের চেনা পরিবেশে হঠাৎ অচেনা আতঙ্ক। কালো পোশাক, বুকে ‘এসআরবি’ লেখা কটি, মুখে মাস্ক আর হাতে হ্যান্ডকাফ-সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ের আড়ালে যেন নেমে এসেছিল অপহরণের এক সুপরিকল্পিত নাটক। বাঁশখালীর প্রেমবাজার থেকে এক ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য।

এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ছয়জনের মধ্যে দুই আসামি বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বাঁশখালী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা হলেন দেলোয়ার হোসেন ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা মো. ছলিম ওরফে সেলিম। দুপুরে তাঁদের আদালতে হাজির করা হয়।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত আব্বাস উদ্দিন ও সুমন মুন্সিকে সাত দিন করে এবং অপর দুই আসামি কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান ও উখিয়ার জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুকে চার দিন করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের মসজিদে বসে অপহরণের পরিকল্পনা

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা জানিয়েছেন, কক্সবাজার মডেল মসজিদে বসে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে অপহরণের প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, গত ১৫ অক্টোবর আব্বাসের বাড়িতে হাসানকে অপহরণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। কক্সবাজারের দেলোয়ারের আত্মীয় আব্বাস বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নের খুদুকখালী গ্রামের বাসিন্দা।

প্রেমবাজারের দোকান থেকে অপহরণ

গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালীর পুঁইছড়ি ইউনিয়নের প্রেমবাজারে ব্যবসায়ী হাসানের মালিকানাধীন মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা কটি, মাথায় কালো ক্যাপ ও মুখে মাস্ক পরা কয়েকজন ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করেন। তাঁরা নিজেদের এসআরবি সদস্য পরিচয় দিয়ে দোকানের ক্যাশে বসে থাকা ব্যবসায়ী এহছানকে তাঁর যমজ ভাই মো. হোছাইনের ছবি দেখিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করেন।

এরপর হাসানের দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। টানাহেঁচড়া করে তাঁকে দোকান থেকে বের করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন যানবাহনে স্থানান্তর করে তাঁকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ।

২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ, না দিলে হত্যার হুমকি

অপহরণের রাতেই শুরু হয় মুক্তিপণের জন্য চাপ। ১৭ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টা ৪০ মিনিট থেকে ভুক্তভোগীর স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল আসতে থাকে। অপহরণকারীরা হাসানকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর ভাই মো. হোছাইনের এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা দায়ের করা হয়।

পাঁচ উপজেলায় অভিযান, টেকনাফ থেকে উদ্ধার

ঘটনার পর অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধার এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে মাঠে নামে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, বিপিএমের দিকনির্দেশনায় সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান ও ডিবির ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে একাধিক দল তদন্ত ও অভিযান পরিচালনা করে।

তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২১ অক্টোবর ভোর আনুমানিক ৪টার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে অপহৃত ব্যবসায়ী হাসানকে উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারের সময় তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন।

গ্রেপ্তার ছয়জন

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান, উখিয়ার জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনু, বাঁশখালীর মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা মো. ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন।

অভিযানকালে অপহরণে ব্যবহৃত একটি প্রাইভেট কার, পাঁচটি কালো রঙের ‘এসআরবি’ লেখা কটি, দুটি ভুয়া এসআরবি পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়।

ভুয়া পরিচয়ের আড়ালে অপরাধচক্র

পুলিশের দাবি, চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি অতীতে উখিয়া এলাকায় এসআরবিতে কর্মরত থাকার সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে পরিচিত হন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে তিনি চাকরিচ্যুত হন এবং কারাভোগ করেন। কারাগারে অবস্থানকালে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে ভুয়া এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে একটি দল গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে তথ্য সরবরাহ করতেন। পরে সুমন ও তাঁর সহযোগীরা ভুয়া এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে ১৩টি মামলা রয়েছে। আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি, জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুর বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি এবং ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তদন্তের বাকি অধ্যায়

একটি দোকান থেকে শুরু হওয়া অপহরণের ঘটনা এখন উন্মোচন করছে ভুয়া পরিচয়, পূর্বপরিকল্পনা ও মুক্তিপণ দাবির অভিযোগে ঘেরা এক জটিল তদন্তের চিত্র। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারিত হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানিয়েছেন, ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না এবং অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির পেছনে বৃহত্তর কোনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল কি না, তা উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
281 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা