আবদুল লতিফ, বাঁশখালী টুডে:
বাঁশখালীতে আক্তার হোসেন ওরফে আক্তার মাঝি (৩৬) নামের এক লবণ ব্যবসায়ীকে মারধরকে কেন্দ্র করে বিএনপির দু’গ্রুপের মধ্যে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাতে ছনুয়া ইউনিয়নের শরীফিয়াপাড়া এলাকায় সংঘটিত এ ঘটনায় এ পর্যন্ত দু’পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছনুয়া ইউনিয়নের ৫নম্বর ওয়ার্ডের শরীফিয়াপাড়ার এলাকায় জনৈক বোরহান উদ্দিন মিজান মিয়ার তফশিলভুক্ত লবণের মাঠের চাষী মোস্তফা আলম একই এলাকার লবণ ব্যবসায়ী আক্তার হোসেন ওরফে আক্তার মাঝিকে তিনশত মণ লবণ বিক্রি করেন। বৃহস্পতিবার রাতে ক্রয়কৃত লবণ গর্ত থেকে নিয়ে যাওয়ার সময় চাষী মোস্তফা আলমের কাছ থেকে টাকা পাবে দাবি করে ওই লবণ নিতে আক্তার হোসেনকে বাধা দেন মিজান মিয়ার অনুগত নুরুল আবছার ওরফে দালাল আবছারের নেতৃত্বে একদল লোক। এসময় তারা আক্তার হোসেনসহ লবণ পরিবহন শ্রমিকদের মারধর করে।
অভিযুক্ত নুরুল আবছার একই এলাকার মৃত মৌলভী মোকাদ্দেছের ছেলে। অপরদিকে ভুক্তভোগী আক্তার হোসেন শরীফিয়াপাড়ার আলী হোছনের ছেলে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবার (৬ জুন) বিকেলে আক্তার হোসেন ছনুয়া মনুমিয়াজী বাজারে বাজার-সদাই করতে গেলে ছনুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল কাদেরের নেতৃত্বে একদল লোক দ্বিতীয়বার তার ওপর হামলা করে বলে অভিযোগ।
সাবেক ইউপি সদস্য আলী হোসেন বলেন, মারধরে গুরুতর আহত আক্তার মাঝিকে ছনুয়া মনুমিয়াজী বাজারে এক পল্লী চিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা করানো হয়। বাঁশখালী থানার এসআই গোলাম সরওয়ারের নেতৃত্বে পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আহত আক্তার মাঝির ছবি তুলে নিয়ে গেছে।
অপরদিকে ভুক্তভোগী আক্তার হোসেন বলেন, আমাকে বাজারে একা পেয়ে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়েছে ফজল কাদেরের নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী। আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক জখম হয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছ থেকে ন্যায় বিচার চাই। শুনেছি মিজান মিয়া আমাকে মেরে উল্টো আমার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করতে গেছে। হক টাকা দিয়ে লবণ কেনা কি অপরাধ?
লবণ বিক্রির ঘটনা গড়ালো অফিস ভাঙচুরে
এদিকে লবণ বিক্রির এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে দলীয় অফিস ভাঙচুরে। শনিবার রাতে ইউনিয়ন বিএনপির দলীয় অফিস ভাঙচুরের এই ঘটনা আ. লীগের লোকজন ঘটিয়েছে বলে প্রচার করে ইউনিয়ন বিএনপির একাংশ। স্থানীয় বিএনপির একাংশের লোকজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে আ. লীগের লোকজনের বিচার দাবি করেন।
ছনুয়া ইউনিয়নের ৫নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আলী হোসেন ওরফে আলী মেম্বার বলেন, নিরিহ লবণ ব্যবসায়ী আক্তার হোসেনকে ফাঁসানোর জন্য বোরহান উদ্দিন ওরফে মিজান মিয়া তার কাচারি ঘরে অবস্থিত ইউনিয়ন বিএনপির দলীয় অফিস ভাঙচুর করেছে। ভাঙচুরের পর দিবাগত রাতে আমার বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়েছে আমাকে গ্রেপ্তার করার জন্য। আমি ৪৫ বছর ধরে বিএনপি করি। দলীয় ভাইদের ঘটনাটি মিটমাট করতে চেয়েছি। এখন আমাকে আ.লীগ ট্যাগ দিয়ে আমার বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়েছে। বিষয়টি নিন্দনীয়।
আলী হোসেন বলেন, নিজেদের অফিস নিজেরা ভাঙচুর করে নিরীহ লবণ চাষী আক্তার হোসেনের বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়েছে মিজান মিয়া। আমি উভয়পক্ষকে ডেকে মধ্যস্থতার চেষ্টা করায় আমার বাড়িতেও পুলিশ পাঠিয়েছে গভীর রাতে।
অপরদিকে লবণ চাষী মোস্তফা আলম বলেন, আমি মিজান মিয়ার লবণ মাঠের চাষী। মিজান মিয়ার কাছ থেকে লবণের মাঠ বর্গা নিয়ে চাষ করি। মিজান মিয়া আমার কাছ থেকে অল্প টাকা পাবে। টাকা তো আমার কাছ থেকে পাবে। আক্তার হোসেন আমার লবণ কিনছে। তাই বলে তাকে মারধর করতে হবে?
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ছনুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি বোরহান উদ্দিন ওরফে মিজান মিয়া বলেন, আমি মোস্তফা আলমের কাছ থেকে টাকা পাবো। সে রাতের আঁধারে আমার অজান্তে লবণ বিক্রি করে দিয়েছে। তাই আমি লোক পাঠিয়ে বাঁধা দিয়েছি।
লবণ ব্যবসায়ী আক্তার হোসেন তো নির্দোষ। তার কাছ থেকে তো টাকা পাবেন না। তাকে মারধর করলেন কেন?— এমন প্রশ্নের জবাবে মিজান মিয়া বলেন, দালালের মাধ্যমে আমার মাঠগুলো লাগিয়ত হয়। আমি দালালের কাছ থেকে দেড় লক্ষ টাকা পাবো। লবণ যে কিনবে কিনুক, লবণগুলো কি দিনে নিয়ে যেতে পারছে না? রাতে কেন নিয়ে যাচ্ছে?
বিএনপির অফিস ভাঙচুর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অফিস কে ভাঙচুর করেছে আমি জানি না। ওটা মামলার পর জানতে পারবো। আমি আলী হোসেনের বাড়িতে পুলিশ পাঠাইনি। পুলিশ পাঠিয়েছে প্রশাসন।
তবে স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের দাবি, আলী হোসেন ওরফে আলী মেম্বার ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে আ. লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদের ‘ডানহাত’ হিসেবে পরিচিত। আলী মেম্বার হারুনুর রশিদকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন; এমন ছবিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে।
এ বিষয়ে বাঁশখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম সরওয়ারকে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক বলেন, ওখানে এক পক্ষের মৌখিক অভিযোগ পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে ফোর্স পাঠিয়েছি। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ভাঙচুরের প্রমাণ পেয়েছে। ঘটনাটি লবণ বিক্রিকে কেন্দ্র করে হয়েছে কিনা সেটি এখন বলতে পারছি না। প্রকৃত সত্য উদঘাটনে আমাদের টিম কাজ করছে। এখনও পর্যন্ত কেউ আমাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দেয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।