মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন>>
বন্দরনগরী চট্টগ্রামের রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যে কজন ব্যক্তিত্ব নিজেদের কর্ম ও নেতৃত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন, মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী তাঁদের অন্যতম। রাজনীতির উত্তাল সময় থেকে সংসদ, প্রশাসন ও নগর নেতৃত্ব-বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের নানা অধ্যায়ে তিনি রেখে গেছেন তাঁর পথচলার ছাপ। বিশেষ করে চট্টগ্রামের প্রথম মেয়র হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন নগর ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
১৯৫০ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার বৈলছড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। শৈশবের মাটির টান পেরিয়ে শিক্ষাজীবনে এগিয়ে গিয়ে ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
তবে তাঁর পথচলার শুরু রাজনীতির মাঠেই। ১৯৬৮ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তরুণ বয়সেই সংগঠন, নেতৃত্ব ও জনসম্পৃক্ততার যে বীজ তাঁর মধ্যে অঙ্কুরিত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে তা বিস্তৃত হয়েছে জাতীয় রাজনীতির পরিসরে।
১৯৭৪ সালে বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজে অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম আদালতের প্রথম শ্রেণির বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতা, বিচারিক দায়িত্ব ও রাজনীতি-জীবনের ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গনে বিচরণ করলেও মানুষের সঙ্গে তাঁর সংযোগ কখনো ছিন্ন হয়নি।
১৯৭৯ সালে বিএনপিতে যোগ দিয়ে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মনোনয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম-১৫ আসন থেকে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী। এরপর রাজনৈতিক পথপরিবর্তনের ধারায় জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় এবং ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও একই আসন থেকে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি নগর নেতৃত্বেও তাঁর উজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয়। ১৯৮৮ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন চট্টগ্রাম পৌর কর্পোরেশনের প্রশাসক ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেই সময়ের নগর ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাঁর নেতৃত্ব চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।
মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাঁশখালীর উন্নয়নকে ঘিরে। কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু, বাঁশখালী প্রধান সড়ক, তৈলারদ্বীপ সেতুসহ বাঁশখালীর বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকার কথা স্থানীয়ভাবে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির সঙ্গে তাঁর নাম তাই বাঁশখালীর রাজনৈতিক ইতিহাসেও উচ্চারিত হয়।
১৯৯৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরে আসেন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম-১৬ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। তবে ওই নির্বাচনে বিজয় তাঁর ভাগ্যে জোটেনি।
বর্তমানে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতন, দলবদল, সংসদীয় নেতৃত্ব, বিচারিক দায়িত্ব ও নগর প্রশাসনের নানা অধ্যায় মিলিয়ে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরীর জীবন যেন চট্টগ্রামের রাজনীতিরই এক দীর্ঘ প্রতিচ্ছবি। বাঁশখালীর বৈলছড়ির মাটিতে জন্ম নেওয়া সেই মানুষটি সময়ের স্রোত পেরিয়ে পৌঁছেছেন চট্টগ্রাম নগরের সর্বোচ্চ নাগরিক নেতৃত্বের আসনে। তাঁর রাজনৈতিক পথচলার প্রতিটি বাঁকে জড়িয়ে আছে একেকটি সময়ের গল্প-যেখানে আছে সংগ্রাম, নেতৃত্ব, পরিবর্তন এবং জনসম্পৃক্ততার দীর্ঘ স্মৃতি।
লেখক>> মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন
সম্পাদক ও প্রকাশক,
বাঁশখালী টুডে।
বাঁশখালী প্রতিনিধি, দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ/ দৈনিক সময়ের আলো