মুক্তির বিকেলে স্বজন-শুভাকাঙ্ক্ষীদের মুখে স্বস্তির হাসি, সরব ছিলেন হাজারো মানুষ
নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে>>
দীর্ঘ ২ মাস ৫ দিনের কারাজীবনের অবসান। অন্ধকার কারাকক্ষ পেরিয়ে অবশেষে মুক্তির আলোয় ফিরলেন ছনুয়া উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ও সমাজসেবক লায়ন মো. আমিরুল হক (এমরুল কায়েস)। রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মিথ্যা মামলায় কারাভোগের পর হাইকোর্ট থেকে স্থায়ী জামিন লাভ করেছেন তিনি।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর প্রিয় মানুষটির মুক্তির খবরে স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অনুসারীদের মাঝে নেমে আসে স্বস্তির আবহ।
শুধু একজন ব্যক্তি নন—এমরুল কায়েসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শিক্ষা, সমাজসেবা ও জনকল্যাণের এক বিস্তৃত অধ্যায়। চট্টগ্রামের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অরবিট ক্রেডিট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শরীফা আর্ট স্কুল, শরীফা সুন্দর লেখা শেখার স্কুল, ছনুয়া মৌলভী নজরুল ইসলামপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, ছনুয়া শরীফা-নজরুল মডেল মাদ্রাসা এবং শরীফা প্রকাশনী প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে রয়েছে।
গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঢেউ
এমরুল কায়েস গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার মুক্তির দাবিতে প্রায় এক হাজার মানুষ প্রতিবাদী স্ট্যাটাস দেন। কেউ লিখেছেন প্রতিবাদের কথা, কেউ তুলে ধরেছেন তার সামাজিক কর্মকাণ্ড; আবার কেউ বলেছেন, কারাবন্দিত্ব যেন তাকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।
তার মুক্তির দাবিতে জামায়াত, বিএনপি, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং সর্বস্তরের মানুষ সরব হন।
ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে গভীর ‘ষড়যন্ত্র’
চলতি মাসে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে এমরুল কায়েসকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।
তার পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির এক নেতা তাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করে একটি মামলায় জড়িয়ে দিয়েছেন। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনাই এর পেছনে কারণ বলে দাবি পরিবারের।
তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার কারণে এমরুল কায়েসের জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছে। আর সেই জনপ্রিয়তাই এখন তার জন্য ‘কাল’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন এমরুল কায়েস
গত ৩ জুলাই বিকেলে চান্দগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল সাদা পোশাকে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা এলাকা থেকে লায়ন মো. আমিরুল হককে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চান্দগাঁও থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় ৮৪ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
‘সাবেক চেয়ারম্যানের ষড়যন্ত্র’—এজাহারে নাম নিয়েও প্রশ্ন
আমিরুল হকের পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। বরং দীর্ঘদিন ধরে অরাজনৈতিক ও সেবামূলক সংগঠন ছনুয়া উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি হিসেবে এলাকার উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এক বিএনপি নেতা তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই তাকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট হিসেবে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে দাবি তাদের।
এদিকে মামলার এজাহারে ‘মো. ইমরুল কায়েস’ নাম উল্লেখ থাকলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম ‘মো. আমিরুল হক’ বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। নামের এই ভিন্নতা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
জামিন নামঞ্জুর হয়ে কারাগারে
গত ৫ জুলাই চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এ তার পক্ষে জামিন আবেদন করা হলে আদালত তা নামঞ্জুর করেন। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এরপর দীর্ঘ ২ মাস ৫ দিন কারাভোগ শেষে উচ্চ আদালত থেকে স্থায়ী জামিন লাভ করেন তিনি। সোমবার বিকেলে কারাগারের ফটক পেরিয়ে মুক্ত জীবনে ফিরে আসেন এমরুল কায়েস।
মুক্তির দাবিতে এককাট্টা ছিলেন অনেকে
গ্রেপ্তারের পর থেকেই তার মুক্তির দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন অঙ্গনে সরব ছিলেন জামায়াত, এনসিপি, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ এবং সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা।
মুক্তির সেই দাবির ধারাবাহিকতায় অবশেষে এসেছে কাঙ্ক্ষিত খবর—কারাগারের দরজা খুলেছে, ফিরে এসেছেন এমরুল কায়েস।
তার কারামুক্তিতে যারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সরব ছিলেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন ছনুয়া উন্নয়ন পরিষদের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক সাংবাদিক মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন।
দীর্ঘ বন্দিত্বের পর মুক্তির এই বিকেল তাই শুধু একজন মানুষের ঘরে ফেরার গল্প নয়; এটি অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের চোখের জল মুছে যাওয়ার গল্প, শুভাকাঙ্ক্ষীদের স্বস্তির গল্প—আর একজন সমাজসেবকের জন্য মানুষের ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে, সেই গল্পও।