নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে:
যে হাত একদিন সন্তানের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়েছিল, সেই বাবাকেই শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হলো সন্তানের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে। সম্পত্তির মোহ যখন মানবিকতার সব বন্ধন ছিন্ন করে দেয়, তখন রক্তের সম্পর্কও হয়ে ওঠে নিষ্ঠুরতার সাক্ষী। বাঁশখালীর এক পিতৃহত্যার ঘটনায় প্রায় দুই বছর পর উঠে এসেছে এমনই এক হৃদয়বিদারক সত্য।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) চট্টগ্রাম মেট্রোর তদন্তে জানা গেছে, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় মীর মজিবুর রহমান খানকে। আর এই হত্যার মূল হোতা হিসেবে উঠে এসেছে তারই বড় ছেলে বেলাল হোসেনের নাম।
মীর মজিবুর রহমান খান—জীবনের দীর্ঘ পথচলায় যিনি বাবুর্চির পেশায় সংসারের হাল ধরেছিলেন। বাঁশখালীর পূর্ব চাম্বল ছিল তার শিকড়ের ঠিকানা। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে তাকে বরণ করতে হয়েছে এক মর্মান্তিক পরিণতি।
তদন্তে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুন মাসে চট্টগ্রাম নগরে মেয়ের বাসায় বেড়াতে এসে নিখোঁজ হন মজিবুর রহমান। পরিবারের উদ্বেগ, মেয়ের দৌড়ঝাঁপ, নিখোঁজ ডায়েরি আর আদালতের নির্দেশে শুরু হয় অনুসন্ধান। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের জাল।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত বেলাল হোসেন এক নারীকে ব্যবহার করে বাবার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের অভিনয় সাজান। সেই কৃত্রিম সম্পর্কের টানে ৭ জুন নগরের বাকলিয়ার একটি বাসায় যান মজিবুর রহমান। সেখানে আগে থেকেই ওঁত পেতে ছিলেন সহযোগী আব্দুল জলিল।
শরবতের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয় ঘুমের ওষুধ। অচেতন হয়ে পড়েন বৃদ্ধ বাবা। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় নগরের বিভিন্ন স্থানে। সন্ধ্যা নামার পর হালিশহরের সিডিএ আউটার রিং রোডের নির্জন এলাকায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাকে। নিথর দেহ ফেলে রাখা হয় রাস্তার পাশের ঝোপে।
একজন বাবার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলো যেন হারিয়ে যায় অন্ধকারে, আর তার পরিচয়ও চাপা পড়ে যায় অজ্ঞাত লাশের খাতায়।
হত্যার দুই দিন পর, ৯ জুন, হালিশহর থানা পুলিশ একটি অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় না মেলায় ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করা হয় সেই লাশ। মামলার তদন্তও একসময় থেমে যায় চূড়ান্ত প্রতিবেদনের পাতায়। কিন্তু সত্য কখনও চিরকাল চাপা থাকে না।
দীর্ঘ তদন্তের পর গত ১৩ জুন কর্ণফুলীর মইজ্জারটেক এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বেলাল হোসেনকে। জিজ্ঞাসাবাদে বাবাকে হত্যার কথা স্বীকার করেন তিনি। আদালতেও ১৬৪ ধারায় দেন জবানবন্দি। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় সহযোগী আব্দুল জলিলকে।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, তদন্তে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। ইতোমধ্যে হত্যায় ব্যবহৃত নারী সহযোগীর পরিচয়ও শনাক্ত করা হয়েছে, যদিও তাকে এখনও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, দুই বছর আগে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা লাশের আলামত এবং আসামিদের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, সেই নিথর দেহটিই ছিল মীর মজিবুর রহমান খানের।
সম্পত্তির লোভে যখন বিবেক হারিয়ে যায়, তখন রক্তের সম্পর্কও হয়ে ওঠে মৃত্যুর ফাঁদ। আর এই ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল লোভের আগুনে পুড়ে গেলে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ও কখনও কখনও সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে।