☰

গুণে গুণে ঘুষ নিলেন চাম্বল ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক বাসু

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
গুণে গুণে ঘুষ নিলেন চাম্বল ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক বাসু প্রকাশ্যে সেবাপ্রার্থীর কাছ থেকে ঘুষ নিচ্ছেন চাম্বল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক বাসু সিকদার। ছবি ভিডিও থেকে নেওয়া।
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী>>
জমির খাজনা দিতে অনলাইনে আবেদন করে সত্যায়ন ও অনুমোদনের জন্য গিয়ে অর্থ দাবির মুখে পড়ার অভিযোগ উঠেছে বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক বাসু সিকদারের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় টাকা লেনদেনের কথোপকথনসংবলিত দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা এলাকার বাসিন্দা রেজাউল আজিম ভূমি উন্নয়ন কর বা জমির খাজনা পরিশোধের জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। আবেদনটি সত্যায়ন ও অনুমোদনের জন্য তিনি চাম্বল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক বাসু সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এ সময় তাঁর কাছে দুই হাজার টাকা দাবি করা হয়।

এ প্রতিবেদকের হাতে আসা ৪৭ সেকেন্ড ও ১৮ সেকেন্ডের দুটি পৃথক ভিডিও ফুটেজে টাকা লেনদেন এবং এ নিয়ে কথোপকথনের প্রমাণ মিলেছে।

ভিডিওতে বাসু সিকদারকে বলতে শোনা যায়, ‘দেখি টাকা পাঁচশ দেন। আমি আপনার কাজের দায়িত্ব নিতে চাইনি। আপনি আটকে গেছেন, এই জন্য আপনার সঙ্গে কথা বলতেছি।’

টাকা হাতে দেওয়ার পর তিনি বলেন, ‘পাঁচশ টাকা দিছেন যে?’ জবাবে রেজাউল আজিম বলেন, ‘পকেটে যা আছে তা দিলাম। এখন ঘরে যাওয়ার জন্য আমার কাছে গাড়ি ভাড়া পর্যন্ত নেই।’ এরপর বাসু সিকদারকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি বিপদে পড়েছেন, এই জন্য তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করতেছি যে। আবেদন ঠিকঠাক মতো করেছেন তো?’

ভুক্তভোগী রেজাউল আজিম বলেন, ‘দাখিলার জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলাম। আমার কাছ থেকে দুই হাজার টাকা চেয়েছিলেন বাসু সিকদার। আমি বললাম, আপাতত ৫০০ টাকা নেন, পরে কাজ হয়ে গেলে বাকি ১ হাজার ৫০০ টাকা দেব। আমার সামনে আরেক ব্যক্তির কাছ থেকে গুনে গুনে দুই হাজার টাকা নিতে দেখেছি। তিনিও দাখিলার জন্য আবেদন করেছিলেন। ওই ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ভিডিও ফুটেজও আমার কাছে আছে।’

পাঁচ ইউনিয়নের ভূমিসেবায় দালালনির্ভরতার অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, চাম্বল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ভূমিসেবা নিতে গিয়ে দালালনির্ভরতা ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শীলকূপ, গণ্ডামারা, শেখেরখীল, ছনুয়া ও পুঁইছড়ি ইউনিয়নের ১৮টি মৌজা নিয়ে এ ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন ভূমিসংক্রান্ত সেবার জন্য এ কার্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল।

অভিযোগ রয়েছে, ভূমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের নির্ধারিত ফি ও সেবার সময়সীমা উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টাঙানো থাকলেও বাস্তবে অনেক সেবাগ্রহীতা সেই অনুযায়ী সেবা পান না। দালালের সহায়তা ছাড়া ফাইল এগোয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির তুলনায় ২০ থেকে ৪০ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কার্যালয়ের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয়ভাবে ভূমি অফিসের প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত শেখেরখীলের খোরশেদুল ইসলাম ও জুনাইদ। খোরশেদুল ইসলাম সেখানে কী কারণে অবস্থান করছেন জানতে চাইলে তিনি উপজেলা ভূমি অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ করে’ সেখানে এসেছেন বলে দাবি করেন। তিনি মাস্টাররোলে চাকরি করেন বলেও জানান। তবে কোন কর্মকর্তার মাধ্যমে সেখানে এসেছেন, জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর না দিয়ে উপসহকারী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন এবং স্থান ত্যাগ করেন।

চা-নাশতার কথা বলে তিন হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ

ভূমি অফিসে উপস্থিত সেবাগ্রহীতা হাফেজ মাওলানা রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, নামজারি খতিয়ান দ্রুত করে দেওয়ার কথা বলে অফিসের কর্মকর্তাদের চা-নাশতার খরচের অজুহাতে দালাল খোরশেদ তাঁর কাছ থেকে তিন হাজার টাকা নেন।

তিনি বলেন, বিষয়টি পাশে থাকা তহসিলদারকে জানালে তিনি খোরশেদের কাছ থেকে ওই টাকা ফেরত নিয়ে দেওয়ার কথা জানান।

এ ছাড়া মো. আজিজুল হক নামে আরেক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, চাম্বল ভূমি অফিসে খতিয়ান করে দেওয়ার কথা বলে অফিস সহায়ক বাসু সিকদার তাঁর কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত খতিয়ান করে দেননি, ফেরত দেননি টাকাও।

ফোন ধরেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চাম্বল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক বাসু সিকদার ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘ভিডিও’র লোকটা আমি, এটা ঠিক আছে। কিন্তু তারা টাকাগুলো নিজ থেকে দিয়েছে। আমি খুঁজে নিই নাই।’

একই বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাঁশখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তামজীদুর রহমান তন্ময় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে স্থানীয় একাধিক সংবাদকর্মীর অভিযোগ, ইউএনও মো. রুহুল আমিন তাঁদের ফোনকল রিসিভ করেন না।

চাম্বল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক বাসু সিকদারের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ ও ভিডিও ফুটেজের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন বলেন, ‘আপনি ভিডিওগুলো ইউএনওকে পাঠান। ইউএনও ব্যবস্থা না নিলে আমি দেখবো।’
442 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা