☰

খাল খনন কর্মসূচি: জলকদর খাল কি ফিরে পাবে তার প্রাণ?

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
খাল খনন কর্মসূচি: জলকদর খাল কি ফিরে পাবে তার প্রাণ? ফাইল ছবি
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন>>
বাঁশখালীর বুক চিরে প্রবাহিত জলকদর খাল একসময় এই জনপদের অর্থনীতি, যোগাযোগ ও কৃষির অন্যতম প্রাণশক্তি ছিল। অতীতকাল থেকে এই খালটি শঙ্খ নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে ব্যবসায়ীদের মালামাল আনা–নেওয়া এবং সাগরে প্রবেশের পথ সহজ করে দিয়েছিল। নৌকা ও সাম্পানের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন পণ্য এই খালপথেই বাঁশখালীতে আসত। ফলে জলকদর খাল শুধু একটি প্রাকৃতিক জলধারা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক রুট।

কিন্তু সময়ের ব্যবধানে অবৈধ দখল, ভরাট এবং দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ার কারণে এই ঐতিহ্যবাহী খালটি আজ বিলীনের পথে। দুই তীরের অবৈধ দখলদারদের চাপে খালটি দিন দিন সরু হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে একসময় যে খাল ছিল বাঁশখালীর অর্থনীতির চালিকাশক্তি, তা এখন মৃতপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।

এমন প্রেক্ষাপটে দেশের খাল পুনরুদ্ধার নিয়ে সরকারের ঘোষিত কর্মসূচি নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। কৃষিজমিতে সেচসুবিধা বাড়াতে পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের অঙ্গীকার করেছে সরকার। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ সোমবার থেকে খাল খনন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম ধাপে সরকারের তিনটি মন্ত্রণালয়ের চারটি সংস্থা বিদ্যমান প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০৪ কিলোমিটার খাল খনন করবে। একই সঙ্গে নতুন প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগও চলছে।

ইতিহাস বলছে, ১৯৭৭ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে খাল খনন কর্মসূচি চালু করেছিলেন। সেই কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের বহু খাল পুনরুদ্ধার হয়েছিল এবং কৃষি উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। বর্তমান কর্মসূচি সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হারিয়ে যাওয়া ৫২০টি নদী, হাজার হাজার খাল এবং তাদের প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এই বৃহৎ কর্মসূচির আলোচনায় এখন উঠে এসেছে বাঁশখালীর মৃতপ্রায় জলকদর খালের বিষয়টিও। স্থানীয়দের আশা, যদি জলকদর খাল এবং এর সঙ্গে যুক্ত শাখা খালগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে খনন করা হয়, তবে বাঁশখালীর কৃষি ও ব্যবসা খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে। কৃষিজমিতে সেচব্যবস্থা উন্নত হবে এবং ব্যবসায়ীরাও আবারও জলপথ ব্যবহার করে সহজে পণ্য পরিবহন করতে পারবেন।

বর্তমানে জলকদর খালের নাব্যতা সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। লবণসহ বিভিন্ন পণ্য ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করতে গিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলোকে নানা বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। অনেক স্থানে খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌযান চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে পরিবেশগত দিক থেকেও খালের এই সংকট মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। বাঁশখালীর পূর্বাঞ্চলের আটটি পাহাড়ি ছড়া পুঁইছড়ি, নাপোড়া, চাম্বল, শীলকূপ, জলদী, পাইরাং, কালীপুর ও সাধনপুর থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়। স্লুইসগেটগুলোর অনেকগুলো দখল হয়ে থাকা বা বন্ধ থাকার কারণেও এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।

সব মিলিয়ে জলকদর খালের বর্তমান অবস্থা শুধু একটি খালের সংকট নয়, এটি পুরো বাঁশখালীর পরিবেশ, কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি সমস্যা। তাই খাল খননের জাতীয় কর্মসূচির আওতায় জলকদর খালকে অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

সরকার যদি সত্যিকার অর্থে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে খালটির পুনঃখনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়, তবে জলকদর আবারও তার হারানো প্রাণ ফিরে পেতে পারে। একই সঙ্গে শাখা খালগুলোও পুনরুদ্ধার করা গেলে বাঁশখালীর কৃষি উৎপাদন বাড়বে, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হবে এবং পাহাড়ি ঢলের পানিও দ্রুত নিষ্কাশনের পথ পাবে।

জলকদর খালকে ঘিরে তাই এখন প্রশ্ন একটাই, সরকারি উদ্যোগ কি সত্যিই এই মৃতপ্রায় খালকে নতুন জীবন দেবে, নাকি এটি কেবল কাগুজে পরিকল্পনাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? বাঁশখালীবাসীর প্রত্যাশা, জলকদর খাল আবারও তার অতীত গৌরব ফিরে পাক এবং এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখুক।

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন 
সম্পাদক ও প্রকাশক, বাঁশখালী টুডে। 
belaluddinctg2002@gmail.com
506 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা