গুমের শিকার আশিকের অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার
মফিজুর রহমান আশিক>>
আজ ৩০ আগস্ট—আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে গুমের শিকার মানুষ, তাদের পরিবার এবং গুমের বিরুদ্ধে লড়াই করা মানবাধিকারকর্মীদের জন্য দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আমার কাছে এই দিনটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক দিবস নয়; এটি আমার জীবনের এক ভয়াবহ অধ্যায়ের স্মৃতি, যে অধ্যায় আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায়।
২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর। সেদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমাকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ ৬০ দিন আমি নিখোঁজ ছিলাম। কোথায় আছি, কেমন আছি, আদৌ বেঁচে আছি কি না—আমার পরিবার, স্বজন কিংবা সহকর্মীদের কেউই জানতেন না।
একজন মানুষ যখন হঠাৎ করে পৃথিবীর পরিচিত সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তার কাছে সময়ের প্রতিটি মুহূর্ত কতটা দীর্ঘ হয়ে ওঠে—তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
হাতকড়া পরা অবস্থায়, চোখ বাঁধা অবস্থায় দিনের পর দিন কাটাতে হয়েছে। প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত ছিল আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর মৃত্যুভয়ে পরিপূর্ণ। কখনো মনে হয়েছে—এই বুঝি আমাকে মেরে ফেলা হবে। কখনো মনে হয়েছে—হয়তো আর কোনোদিন পরিবারের কাছে ফিরতে পারব না।
শারীরিক নির্যাতনের যে যন্ত্রণা আমি সহ্য করেছি, তার অনেকটাই আজও শরীর ও মনে বয়ে বেড়াচ্ছি। কিছু ক্ষত সময়ের সঙ্গে শুকিয়ে যায়, কিন্তু কিছু ব্যথা শরীরের পাশাপাশি মনের ভেতরও স্থায়ী হয়ে থাকে। সেই ব্যথা নিয়েই হয়তো বাকি জীবন কাটাতে হবে।
অবশেষে ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আমি মুক্তি পাই। কিন্তু আমার জীবনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার যেন সেখানেই শেষ হয়নি।
দ্বিতীয়বার, ২০২২ সালের ১৫ অক্টোবর, সিটিটিসি কর্তৃক আমাকে গুম করা হয়। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তৎপরতা এবং বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী ভাইয়ের নিয়মিতভাবে আমার সন্ধান দাবি ও বিষয়টি জনসম্মুখে তুলে ধরার কারণে আমাকে দীর্ঘদিন নিখোঁজ রাখা সম্ভব হয়নি।
গুম শুধু একজন মানুষকে নিখোঁজ করে না
গুমের ভয়াবহতা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন মানুষকে যখন তার পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন একই সঙ্গে একটি পরিবারকেও অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।
একজন মা প্রতিদিন অপেক্ষা করেন—তার সন্তান কি ফিরবে? একজন স্ত্রী অপেক্ষা করেন—তার স্বামী কি জীবিত আছেন? একজন সন্তান অপেক্ষা করে—তার বাবা কি কোনোদিন তাকে আবার বুকে জড়িয়ে ধরবেন? কিন্তু কোনো প্রশ্নের উত্তর মেলে না।
প্রিয় মানুষটি জীবিত নাকি মৃত—এই অনিশ্চয়তার চেয়ে ভয়াবহ যন্ত্রণা আর কী হতে পারে? যাদের জীবনে এমন অভিজ্ঞতা আসেনি, তারা হয়তো এর গভীরতা কখনোই পুরোপুরি অনুভব করতে পারবেন না। এটি শুধু বন্দিত্ব নয়; এটি একটি পরিবারকে প্রতিদিন মানসিকভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রাখার মতো এক নির্মম অভিজ্ঞতা।
রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার
গুমের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু মানবিক বা রাজনৈতিক দাবি নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনেরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালে Rome Statute of the International Criminal Court-এ স্বাক্ষর করে এবং ২০১০ সালের ২৩ মার্চ তা ratify করে। এই আইনের অধীনে ব্যাপক বা systematic attack-এর অংশ হিসেবে সংঘটিত enforced disappearance মানবতাবিরোধী অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।
এরপর ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance (ICPPED)-এ আনুষ্ঠানিকভাবে accession করে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য এই কনভেনশন ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে কার্যকর হয়েছে।
এর অর্থ হলো—গুম প্রতিরোধ, গুমের অভিযোগের তদন্ত, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং দায়ীদের জবাবদিহির বিষয়ে বাংলাদেশের এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রয়েছে। এই অঙ্গীকার কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের প্রকৃত মূল্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন তার প্রতিফলন রাষ্ট্রের কার্যক্রমে দেখা যাবে।
অতীতের গুমের সত্য উন্মোচন জরুরি
আমার অভিজ্ঞতা আমাকে একটি বিষয় খুব গভীরভাবে শিখিয়েছে—রাষ্ট্রের ক্ষমতা কখনোই একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার, জীবন ও মানবিক মর্যাদার ঊর্ধ্বে হতে পারে না।
গুম কোনো রাজনৈতিক মতের বিষয় নয়। গুমের শিকার ব্যক্তি যে রাজনৈতিক মতাদর্শেরই হোন না কেন, তার জীবন, স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারও রাজনৈতিক পরিচয় তাকে গুমের শিকার হওয়ার বৈধ লক্ষ্য বানাতে পারে না।
তাই আজকের এই আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে আমার দাবি খুব স্পষ্ট—বাংলাদেশে অতীতে সংঘটিত প্রতিটি গুমের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করতে হবে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের কাছে সত্য প্রকাশ করতে হবে। দায়ীদের যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে কোনো নাগরিক যেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হয়ে গুম না হন, সেই নিশ্চয়তাও রাষ্ট্রকে দিতে হবে।
সত্যের কাছে একদিন ফিরতেই হবে
একজন গুমের শিকার মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হয়তো শুধু মুক্তি নয়—সত্যের স্বীকৃতি এবং ন্যায়বিচার। আমার মতো যারা এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তারা জানেন—গুমের অন্ধকার কেবল একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং কখনো কখনো একটি রাষ্ট্রের বিবেককেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
আজ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবসে আমি সেইসব মানুষের কথা স্মরণ করছি, যারা গুমের শিকার হয়েছেন; সেইসব পরিবারের কথা স্মরণ করছি, যারা বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় দিন কাটিয়েছেন; এবং সেইসব মানুষের প্রতি সংহতি জানাচ্ছি, যারা সত্য ও ন্যায়বিচারের জন্য এখনো লড়াই করে যাচ্ছেন।
সত্যকে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু মুছে ফেলা যায় না।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।
লেখক: মফিজুর রহমান আশিক
সাবেক যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল।