নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে>>
বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি। জীবিকার সন্ধানে গভীর সমুদ্রে পাড়ি জমান জেলেরা। কারও ঘরে অপেক্ষায় থাকেন বৃদ্ধ মা, কারও চোখে স্বামীর ফেরার প্রতীক্ষা নিয়ে বসে থাকেন স্ত্রী, আবার কারও শৈশব থমকে যায় বাবার অপেক্ষায়। কিন্তু সাগরের বুক থেকে সেদিন আর ফিরে আসেননি ৩১ জেলে। দীর্ঘশ্বাস হয়ে রয়ে গেছে তাঁদের পরিবারের কাছে সেই হারিয়ে যাওয়ার গল্প।
২০১৩ সালের মার্চে বঙ্গোপসাগরে সংঘটিত ৩১ জেলে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। দীর্ঘ তদন্ত, একাধিক আসামির গ্রেপ্তার, আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং অভিযোগপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে মামলাটি পেয়েছে নানা বাঁক। এ ঘটনায় ছনুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এম. হারুনুর রশীদের নামও আলোচনায় আসে। ১৯৯৯ সালে কাজের মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনায় হারুনের বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ থানায় মামলা হয়েছিল। ২০২৪ সালে ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হারুনুর রশিদ বহুদিন দেশে আত্নগোপনে ছিলেন। এরপর তিনি তথ্য গোপন করে বিভিন্ন দেশ হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিক পাড়ি জমান।
একসময় স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত হারুনুর রশীদকে ঘিরে অভিযোগের পরিসর কেবল সমুদ্রের জলদস্যুতার ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়। সাংবাদিক অপহরণ, হামলা, জমি দখল ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। এসব অভিযোগের কিছু নিয়ে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ্যে কথা বলেছেন, কিছু বিষয় আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
টেলিভিশনের পর্দায় উঠে এসেছিল জলদস্যুতার চিত্র
২০১৩ সালে বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘তালাশ’-এ বঙ্গোপসাগরে জলদস্যুদের তৎপরতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বঙ্গোপসাগরে ডাকাতির ঘটনায় হারুন বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা ও হারুনুর রশীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল। তালাশ টিমের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর প্রচারিত ওই প্রতিবেদন দেশব্যাপী আলোচিত হয়।
৩১ জেলে হত্যার সেই ভয়াবহ রাত
২০১৩ সালের ২৩ মার্চ সকালে বাঁশখালীর শেখেরখীল ইউনিয়নের গুইল্লাখালী এলাকার বাসিন্দা নেজাম উদ্দিনসহ ১২ মাঝিমাল্লা ‘আল্লাহর দান’ নামের একটি ফিশিং বোট নিয়ে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান। পরদিন দিবাগত রাতে তাঁদের বোটে ১৫ থেকে ১৬ মণ ইলিশ ধরা পড়ে।
একই এলাকায় মাছ ধরছিল ‘আল্লাহর দান-১’ ও ‘আল-মক্কা’ নামের আরও দুটি ফিশিং বোট। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই রাতে ৩০ থেকে ৩৫ জন সশস্ত্র ব্যক্তি তিনটি বোটে হামলা চালায়। মাঝিমাল্লাদের হাত-পা বেঁধে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। মাছসহ দুটি বোটও নিয়ে যায় হামলাকারীরা।
এ ঘটনায় তিনজন জেলে প্রাণে বেঁচে যান। বাকিদের মধ্যে ৩১ জনকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁদের কয়েকজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ অন্যদের পরিণতি নিয়েও তৈরি হয় গভীর অনিশ্চয়তা।
ঘটনার পর নিহত নেজাম উদ্দিনের ছোট ভাই শাহাব উদ্দিন কুতুবদিয়া থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৩০ থেকে ৪০ জনকে আসামি করা হয়। পরে তদন্তের দায়িত্ব নেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
মামলার তদন্ত বিভিন্ন কর্মকর্তার হাত ঘুরে এগোয়। তদন্তের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর কক্সবাজার আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে একাধিক ব্যক্তির নাম আসে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামি মো. ওয়াসিমের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হারুনুর রশীদের নাম উঠে এসেছিল।
দেশে ফিরেই গ্রেপ্তার
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে দেশে ফেরার পর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন এম. হারুনুর রশীদ।
প্রদত্ত তথ্যমতে, ১৫ সেপ্টেম্বর সকালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বয়স তখন ৫৮ বছর। তিনি ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি।
সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। প্রথমে মালয়েশিয়া, পরে দুবাই হয়ে আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে অবস্থান করেন। সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
দেশে ফেরার পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো মোকাবিলা করে ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা ছিল।
পুলিশ জানায়, ছনুয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি আমান উল্লাহ ওরফে আনু হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে করা মামলাসহ ৫ আগস্ট-পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে ছয় থেকে সাতটি মামলা রয়েছে হারুনের বিরুদ্ধে। আমান উল্লাহ আনু হত্যা মামলায় হারুনুর রশীদসহ ১০ আসামি হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছিলেন। নির্ধারিত সময় শেষে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশও ছিল। তবে তিনি আত্মসমর্পণ না করে বিদেশে চলে যান।
বাঁশখালী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল হক জানিয়েছিলেন, হারুনুর রশীদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ও ৫ আগস্ট-পরবর্তী ঘটনাসহ একাধিক মামলা রয়েছে। অন্য কোনো মামলা আছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছিল।
নকল স্বর্ণ ব্যবসার জনক আলমগীর কবির
হারুনুর রশীদের সহোদর আলমগীর কবিরকে ঘিরেও ছনুয়ায় নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বপ্নে স্বর্ণের ডেকসি পাওয়ার কথা বলে দূর-দূরান্ত থেকে বিত্তশালী ব্যক্তিদের ছনুয়ায় আনা হতো। এরপর তাঁদের মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়া এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হতো। এ বিষয়ে স্থানীয় ও জাতীয় দৈনিক বিভিন্ন সময় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ভুক্তভোগীর হাতে বন্দুক দিয়ে ছবি তোলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব অভিযোগে আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার কথা জানা গেছে।
মতের অমিল হলেই করা হতো নির্যাতন
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাববিস্তার, রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে তাঁরা হামলা, মারধর ও ভয়ভীতির শিকার হয়েছেন। তাঁদের কেউ গ্রাম ছেড়েছেন, কেউ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হারিয়েছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে নিজ এলাকায় ফিরতে পারছেন না।
অভিযোগ রয়েছে, হারুনুর রশীদের বাড়িকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করত। কেউ কেউ বাড়িটিকে ‘টর্চার সেল’ বলেও অভিহিত করেছেন।
সাংবাদিক বেলাল উদ্দিনকে অপহরণ
২০২০ সালের ২ আগস্ট সাংবাদিক মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিনকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যুতে অতিরিক্ত ফি নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের জের ধরে তাঁকে অপহরণ করা হয়েছিল। সেসময় এটি বাঁশখালী জুড়ে আলোচিত ঘটনা ছিল।
সাংবাদিকের অভিযোগ অনুযায়ী, হারুনুর রশীদের কয়েকজন সহযোগী তাঁকে অপহরণ করে। বিষয়টি জানার পর তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের হস্তক্ষেপে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে হারুনুর রশীদের বাড়ি থেকে উদ্ধার করেন।
এ ঘটনায় হারুনুর রশীদের পাঁচ সহযোগীর বিরুদ্ধে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়েছিল বলে জানা যায়। এজাহারে হারুনুর রশীদের সংশ্লিষ্টতার বিষয় উল্লেখ থাকলেও তাঁকে আসামি করা হয়নি।
বাড়িছাড়া স্কুলশিক্ষক আবু ছিদ্দিক
ছনুয়ার মোহাজেরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ছিলেন আবু ছিদ্দিক ওরফে আবু ছিদ্দিক মাস্টার। তাঁর অভিযোগ, ২০১৯ সাল পর্যন্ত তার চাকরির মেয়াদ থাকলেও ২০১১ সালে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিজ গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। পরে বাঁশখালী পৌরসভা এলাকায় বসবাস শুরু করেন এবং বর্তমানে চাম্বল বাজার এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করে থাকেন।
আবু ছিদ্দিক মাস্টারের ভাষ্য, ২০১৭ সালে মসজিদে নামাজ শেষে বের হওয়ার সময় একদল লোক অস্ত্র তাক করে তাঁকে অপহরণ করে খুদুকখালী লঞ্চঘাটে নিয়ে যায়। সেখান থেকে সাগরে নিয়ে যাওয়ার আগেই পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে।
তিনি বলেন, ‘আহত অবস্থায় আমাকে উদ্ধার করে প্রথমে বাঁশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এরপর আর ছনুয়ায় ফিরে যাইনি। আমার মাছের প্রজেক্ট, বাড়িঘরসহ বিভিন্ন সম্পদ লুট করা হয়েছে বলে আমার অভিযোগ। এখনো ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারি না। ভারতে গিয়েও চিকিৎসা নিয়েছি। মা-বাবার কবর জিয়ারত করতে কিংবা নিজের বসতভিটা দেখতে ছনুয়ায় যেতে পারি না।’
নির্বাচনে প্রতিপক্ষকে সমর্থন করে হামলার শিকার রায়হান
২০২২ সালের ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হারুনুর রশীদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন বলে জানান স্থানীয় পশুচিকিৎসক মোহাম্মদ রায়হান। তাঁর বাড়ি ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের জমিলাপাড়ায়।
রায়হানের অভিযোগ, নির্বাচনের পর ১৫ জুনের কাছাকাছি সময়ে হারুনুর রশীদের কয়েকজন সহযোগী তাঁর ওপর হামলা চালান। এ সময় তাঁকে মারধর করার পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়।
রায়হান বলেন, “সেদিন বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমাকে প্রচুর মারধর করা হয়েছিল। আমার মোটরসাইকেল ও টাকা এখনো ফেরত পাইনি। হুমকি-ধমকির ভয়ে থানায় গিয়ে মামলা করার সাহসও হয়নি।”
ছনুয়া ছেড়ে কক্সবাজারে পল্লী চিকিৎসক
ছনুয়া ইউনিয়নের আবদুল্লাহর দোকান এলাকায় ওষুধের ফার্মেসি পরিচালনা করতেন পল্লী চিকিৎসক মোহাম্মদ সাগর। তাঁর অভিযোগ, ২০২২ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় তাঁর ফার্মেসিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়।
এ ঘটনার পর তিনি ছনুয়া ছেড়ে শেখেরখীল রাস্তার মাথা এলাকায় চলে যান। সেখানেও থাকতে না পেরে পরে কক্সবাজারে চলে যান বলে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি কক্সবাজারে বসবাস করছেন।