☰

অর্থের বিনিময়ে নেতৃত্ব নয়, মেধা-সততায় গড়ে উঠুক নতুন রাজনীতি

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অর্থের বিনিময়ে নেতৃত্ব নয়, মেধা-সততায় গড়ে উঠুক নতুন রাজনীতি ফাইল ছবি
হাফিজুর রহমান হিরো>>
যে দেশে জন্মের হার বেশি সেই দেশে তরুণ্যের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হয়, যেহেতু জনসংখ্যা বহুল দেশ সেহেতু তারুণ্যের প্রভাব লক্ষ্যণীয়। 

তারুণ্য নির্ভর রাজনীতি সারাদেশে সাড়া জাগিয়েছে, সেক্ষেত্রে স্থানীয় ভাবে কেন নয়? রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, দেশ বিদেশের সব খবরাখবর রাখছে তরুণ সমাজ। সমাজকে আলোকিত করতে চাইলে নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা প্রয়োজন।

রাজনীতি একটি রাষ্ট্র ও সমাজের গতিপথ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান শক্তি। মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরই বর্তায়।

যখন রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে অন্যায়, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও ব্যক্তিস্বার্থের চর্চায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন মানুষের প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে তৈরি হয় গভীর দূরত্ব। সেই বাস্তবতায় পরিবর্তনের অন্যতম সম্ভাবনাময় শক্তি হয়ে উঠতে পারে তারুণ্যনির্ভর নেতৃত্ব।

‘তারুণ্য মানে এক ঘোর অমানিশায় আলোর প্রদীপ; 
তারুণ্য মানে নতুন চিন্তা, অসীম সাহস, দূর্ভেদ্য জায়গায় পৌঁছানোর প্রচেষ্টা, পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা,
প্রচলিত ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করার দৃঢ় চিত্ত।’

প্রযুক্তিনির্ভর এই পৃথিবীতে বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্ম তথ্যপ্রযুক্তি, বিশ্বায়ন, শিক্ষা ও যোগাযোগের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে অনেক বেশি পরিচিত। ফলে তারা রাষ্ট্র ও সমাজকে পুরোনো কাঠামোর বাইরে থেকে নতুনভাবে দেখতে পারে। 

তাদের কাছে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম নয় এটি হতে পারে জনসেবা, জবাবদিহি ও সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম হাতিয়ার। দীর্ঘদিনের ক্ষমতা কেন্দ্রীক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অনেক সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক, জনকল্যাণমুখী  প্রতিষ্ঠানকে স্থবির করে দেয়। একই নেতৃত্ব, একই চিন্তাধারা এবং একই রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতে থাকলে সেখানে নতুন সম্ভাবনার জায়গা সংকুচিত হয়। 

ফলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি হয় না, নতজানু নীতিতে ভর করে অনেক যোগ্য, দক্ষ, মেধাবী নেতৃত্ব ঐ অপসংস্কৃতির বলি হতে হয়। এহেন চেতনাশূন্য বিবেক বর্জিত নেতৃত্ব দল ও দেশের বোঝা হয়ে দাড়াঁয়, তারা আর নতুন কিছু চিন্তা করতে পারে না।  ঢুকেপড়ে সিন্ডিকেটের ধ্রুমজালে।

বিশেষ করে যখন রাজনৈতিক পদ-পদবি ব্যক্তিগত প্রভাব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা কিংবা পারিবারিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ দুর্বল হয়ে যায়। এই জায়গাতেই তরুণ নেতৃত্ব নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

তারুণ্যের সঙ্গে প্রয়োজন সততা, নৈতিকতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, ইতিহাস ও সংবিধান সম্পর্কে জ্ঞান এবং ভিন্নমতকে সম্মান করার মানসিকতা। 

তরুণ নেতৃত্ব যদি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকগুলোই অনুসরণ করে, তাহলে বয়সের পরিবর্তন ঘটলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাই প্রয়োজন প্রজন্মের পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পরিবর্তন।

একজন তরুণ জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক কর্মীর কাছে মানুষের প্রত্যাশা ভিন্ন। মানুষ চায় স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত, নাগরিক সেবা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, শিক্ষার প্রসার, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান। তরুণ নেতৃত্ব যদি এসব প্রত্যাশাকে বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দিতে পারে, তবে রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও নতুনভাবে ফিরে আসতে পারে।

একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। তাই তরুণদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা নয়; বরং যোগ্যতা, সততা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে তাদের নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। 

একই সঙ্গে অভিজ্ঞ প্রজন্মের জ্ঞান ও তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তির সমন্বয় ঘটানোও যুক্তিযুক্ত। রাজনীতির পরিবর্তন কখনো কেবল মুখ পরিবর্তনের মাধ্যমে আসে না; আসে চিন্তার পরিবর্তন, মূল্যবোধের পরিবর্তন এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিবর্তনের মাধ্যমে। 

অন্যায়, দুর্নীতি ও দীর্ঘদিনের স্থবির রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিপরীতে যদি তারুণ্য সততা, মেধা, সাহস ও জনকল্যাণের অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে আসে, তবে তারা রাজনীতির গতিপথে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

অতএব, তারুণ্যনির্ভর নেতৃত্ব কোনো আবেগের স্লোগান নয়; এটি একটি সম্ভাবনার নাম। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন যোগ্যতা, নৈতিকতা, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ দায়বদ্ধতা। 

তখনই নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব রাজনীতির পুরোনো অচলায়তন ভেঙে একটি অধিকতর স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতির পথ তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো টাকার কুমিরের কাছে কি করে মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণ নেতারা কিভাবে টিকে থাকবে? 

এখানেই মূল সমস্যা, আমরা যদি বুঝাতে সক্ষম হই, যারা আপনার পিছনে টাকা খরচ করছে সেই নিশ্চিত কোন না কোন ভাবে টাকা গুলো তুলে আনবে, হয়তো বা জনগণের টাকা মেরে না হয় উন্নয়নের বরাদ্দের টাকা মেরে না হয় ঘুষ খেয়ে নয়তো বা অনৈতিক কর্মকান্ডে সাহায্য সহযোগিতা করে বেনিফিটেড হবে। এই বিষয়টি সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং
অর্থহীন!  আমাদের সমাজকে বিষয়টি বুঝাতে হবে।

তারুণ, দক্ষ, মেধাবী ছেলেমেয়েরা যখন জনগণকে বুঝাতে সক্ষম হবে, যারা অতিরঞ্জিত আশা দিচ্ছে তারা একদিন তোমাদের হতাশার সাগরে ভাসিয়ে দিবে। টাকা নিয়ে নেতা বা জনপ্রতিনিধি বানালে ঠিকেই শতগুন বেশি টাকার বিনিময়ে সেবা নিতে হবে এটা সমাজকে বুঝতে হবে, এর দায়িত্ব তরুণদের।  

রাজনীতি কোন রাজকীয় পেশা নয় এটি সমাজের কল্যাণের একটি সিঁড়ি মাত্র। অপরাজনীতি করলে সমাজ, রাষ্ট্র তাকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে। এটি গোপনীয় বিষয় নয়, সেই অতীতকে যদি সমাজে বুঝাতে সক্ষম হয় তাহলে আমাদের মাইন্ডসেট পরিবর্তন হবে, এটি অন্তত আমি আশাবাদী। 

জনকল্যাণমুখী কাজে কোন ধরনের বেনিফিশিয়ারি থাকবে না, যে যার মতো ন্যায্য বিচারটা পাবে, ন্যায্য অধিকারটা পাবে।  তাহলে মুক্তির ঝাণ্ডা তারুণ্যের হাত ধরে উড্ডীন হবে। 

এমন কঠিন বাস্তবতায় রুচিহীন প্রবীন নেতাদের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়ে, সামজকে কলঙ্কমুক্ত করতে একজন সৎ সাহসী নেতা হিসাবে আপনি আপনাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ুন। 

সমাজ রাষ্ট্র আপনাকে গ্রহণ করতে বাধ্য। একসময় আপনি অপরিহার্য হয়ে উঠবেন এটাই যুগের বাস্তবতা। সিদ্ধান্ত নেন:  আপনি কি আলফা প্রজন্মের ধারক বাহক হবেন নাকি গনতন্ত্রের নামে ভাইপুতন্ত্রের গোলাম হবেন?

প্রশ্ন আমার, উত্তর আপনার কাছে। ভাবুন, গভীর চিন্তায় মগ্ন হোন, মনীষীদের বই পড়ুন। সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা উপলব্ধি করুন, হে তরুণ আপনার দুয়ারে! বৃদ্ধ মাঝি মল্লারা সাত সাগরের মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছে আর আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। 

লেখক>> হাফিজুর রহমান হিরু
(বি.এ-অনার্স, এম.এ-মাস্টার্স)
(আইন-২য় বর্ষ)
221 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা