মায়ের ত্যাগ, বাবার স্মৃতি আর অদম্য অধ্যবসায়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা
নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে:
বাঁশখালীর পুঁইছড়ি ইউনিয়নের আরবশাহ্ ঘোনার সন্তান তাহাসিন হোসাইন চৌধুরীর জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ বছরের কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ, ধৈর্য এবং সংগ্রামের পর একাডেমিক এমবিবিএস জীবন সম্পন্ন করে তিনি এখন চিকিৎসা পেশার বাস্তব অঙ্গনে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) থেকে চীনের জিয়াংসু প্রদেশের ইয়াংঝু শহরে অবস্থিত সুবেই হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর নতুন যাত্রা শুরু হচ্ছে।
নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে আবেগঘন ভাষায় তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর দীর্ঘ পথচলার গল্প—যে গল্পে রয়েছে স্বপ্ন, সংগ্রাম, হারানোর বেদনা, মায়ের সীমাহীন ত্যাগ এবং সফলতার দীপ্তি।
তাহাসিন হোসাইন চৌধুরী মরহুম কায়েস চৌধুরী ও দিলোয়ারা কায়েস সুমির সন্তান। তাঁর এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান মায়ের বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। নিজের এমবিবিএস ডিগ্রি তিনি উৎসর্গ করেছেন মায়ের প্রতি। তাঁর ভাষায়, মায়ের নিরন্তর দোয়া, ভালোবাসা ও ত্যাগই তাঁকে প্রতিটি প্রতিকূলতার মধ্যে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
তবে তাহসিনের সাফল্যের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক হৃদয়বিদারক অধ্যায়ও।
তাঁর বাবা কায়েস চৌধুরী দীর্ঘদিন কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। একপর্যায়ে তাঁর দুটি কিডনিই বিকল হয়ে যায়। চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা গেলে তাঁকে বাঁচানোর সম্ভাবনা রয়েছে। স্বামীকে বাঁচানোর শেষ আশায় নিজের একটি কিডনি দান করেন স্ত্রী দিলোয়ারা কায়েস সুমি। স্বামীর জীবন বাঁচাতে একজন স্ত্রীর পক্ষ থেকে যা সম্ভব, তার সবটুকুই করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভালোবাসা, ত্যাগ এবং চিকিৎসার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে ২০২০ সালের ২৩ এপ্রিল না ফেরার দেশে পাড়ি জমান কায়েস চৌধুরী।
কায়েস চৌধুরী ছিলেন পুঁইছড়ির ঐতিহ্যবাহী আরবশাহ্ জমিদার বাড়ির মো. হোসাইন চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র।
বাবার মৃত্যুর শোক তখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি পরিবার। সেই কঠিন সময়েই ২০২১ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে সুদূর চীনে পাড়ি জমান তাহাসিন। প্রিয়জনদের ছেড়ে ভিনদেশে শুরু হয় তাঁর নতুন সংগ্রাম।
তাহাসিন জানান, মেডিকেল শিক্ষাজীবনের পাঁচ বছর মোটেও সহজ ছিল না। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ক্লাস, দীর্ঘ ল্যাব সেশন, হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল পোস্টিং, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট এবং কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে কাটাতে হয়েছে প্রতিটি দিন। পরিবার ও স্বজনদের থেকে হাজার মাইল দূরে থেকে অনেক ব্যক্তিগত স্বপ্ন, ইচ্ছা এবং আনন্দ বিসর্জন দিতে হয়েছে ভবিষ্যতের লক্ষ্য পূরণের জন্য।
অনেক সময় ক্লান্তি এসেছে, হতাশা গ্রাস করেছে, অনিশ্চয়তা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু প্রতিটি প্রতিকূলতা তাঁকে আরও দৃঢ়, ধৈর্যশীল এবং আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। তাঁর মতে, এই পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একজন চিকিৎসক হওয়ার যোগ্যতা দেয়নি, বরং একজন দায়িত্বশীল ও বাস্তবতাবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলেছে।
সফলতার এই দিনে তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন প্রয়াত বাবা, দাদা ও দাদিকে। তাঁর বিশ্বাস, তাঁদের দোয়া ও আশীর্বাদই তাঁর পথচলার পাথেয় হয়ে রয়েছে। বাবার কথা স্মরণ করে তিনি লিখেছেন, বাবা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয়তো তাঁর চেয়েও বেশি খুশি হতেন।
বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো স্মরণীয় সময়, ক্লাসরুমের দিনগুলো, হাসপাতালের অভিজ্ঞতা, পরীক্ষার উদ্বেগ, সফলতার আনন্দ এবং অসংখ্য স্মৃতি আজ তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। ব্যাচেলর জীবনের অধ্যায় শেষ হলেও সেই স্মৃতিগুলো আজীবন তাঁকে অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করেন তিনি।
একজন শিক্ষার্থী থেকে একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক—এই রূপান্তরের মুহূর্তে তাহসিন সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনি চান সততা, নিষ্ঠা, মানবিকতা ও পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে একজন আদর্শ চিকিৎসক হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
বাঁশখালীর প্রত্যন্ত জনপদ আরবশাহ্ ঘোনা থেকে শুরু হওয়া এই পথচলা আজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পৌঁছেছে। পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন, মায়ের অসীম ত্যাগ এবং নিজের অদম্য অধ্যবসায়কে সঙ্গী করে তাহসিন হোছাইন চৌধুরী এগিয়ে চলেছেন মানবসেবার মহান ব্রতে। তাঁর এই অর্জন শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো পুঁইছড়ি ইউনিয়ন ও বাঁশখালীবাসীর জন্য গর্ব ও অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।