☰

এটিএন বাংলার লোগো নকল করে প্রতারণা: চাটগামীর বিরুদ্ধে দুই মামলা

রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
এটিএন বাংলার লোগো নকল করে প্রতারণা: চাটগামীর বিরুদ্ধে দুই মামলা শফকত হোসাইন চাটগামী ও এটিএন বাংলার লোগো নকল করে পরিচালিত ফেসবুক পেজের ছবি
‘একেএন বাংলা’ পেজ খুলে প্রতারণা ও মানহানির অভিযোগ

বাঁশখালী টুডে ডেস্ক:
সংবাদের নামে আলো ছড়ানোর কথা, অথচ সেই আলোকেই যদি কেউ অন্ধকারের পর্দা টেনে দেন—তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সংবাদ কোথায় শেষ আর প্রতারণা কোথায় শুরু?
জাতীয় স্যাটেলাইট টেলিভিশন এটিএন বাংলার লোগোর সঙ্গে অবিকল মিল রেখে ‘একেএন বাংলা’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করে দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণা ও মানহানিকর কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ উঠেছে সাংবাদিক শফকত হোসাইন চাটগামীর বিরুদ্ধে। 

এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন দুই ভুক্তভোগী। মামলার বাদীরা হলেন—শীলকূপ ইউনিয়নের মাওলানা জালাল উদ্দীন এবং বাহারছড়া ইউনিয়নের মো. ওয়াজেদ আলী।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ‘একেএন বাংলা’ নামে একটি ফেসবুক পেজ খুলে টেলিভিশন চ্যানেলের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানহানিকর ভিডিও প্রচার করা এবং এর মাধ্যমে অর্থ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে শফকত হোসাইন চাটগামীর বিরুদ্ধে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, কথিত ওই ফেসবুক পেজ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে টাকা দাবি করার একাধিক কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব কল রেকর্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিকবার আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

বাদীপক্ষের অভিযোগ, ‘একেএন বাংলা’ নামে পরিচালিত পেজটি কোনো নিবন্ধিত টেলিভিশন চ্যানেল নয়। অথচ এটিএন বাংলার লোগোর আদলে পরিচিতি তৈরি করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ভিডিও প্রকাশ করে তা সরিয়ে নেওয়া বা প্রচার বন্ধের বিনিময়ে অর্থ দাবি করার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি এখন আইনগত প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করবে বলে প্রত্যাশা ভুক্তভোগীদের।

শফকত হোসাইন চাটগামী গণ্ডামারা ইউনিয়নের পশ্চিম বড়ঘোনা গ্রামের মাওলানা রৌশন আলীর ছেলে। ১৯৯১ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের পর তিনি গণ্ডামারা ছেড়ে বাঁশখালী পৌরসভা এলাকায় চলে আসেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বর্তমানে তিনি বাঁশখালী পৌরসভার আমিরাঘোনা এলাকায় সরকারি খাসজমিতে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছেন।

এদিকে, শফকত হোসাইন চাটগামীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে এসব মামলার অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

সংবাদমাধ্যম মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়ার কথা—সত্যকে সামনে আনার কথা। সেই পরিচয়ের আড়ালে যদি প্রতারণার অভিযোগ ওঠে, তবে তা শুধু একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; প্রশ্ন ওঠে পুরো সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও। এখন দেখার বিষয়, ‘একেএন বাংলা’ ঘিরে ওঠা অভিযোগের অন্তরালে সত্যের আলো কতটা, আর অভিযোগের ছায়া কতটা।

আ. লীগের আমলে সুবিধা নেয়ার অভিযোগ

শফকত হোসাইন চাটগামী ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যাপক লেখালেখি করেন। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। অন্যদিকে, আ. লীগ সরকারের আমলে সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর নাতি পরিচয়ে বিভিন্ন সময় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসবের প্রতিদানস্বরূপ মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী চাটগামীকে আলমারিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উপহার দেন। একটি ভিডিওতে চাটগামী নিজেই তার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ওই ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, কেউ আমাকে একটা পাতার বিড়িও দেয়নি। কিন্তু মোস্তাফিজুর রহমান এমপি মহোদয় দৃষ্টিনন্দন আলমারি উপহার দিয়েছেন।

ফেসবুকের নিউজফিডে এখনও ঘুরে ‘জুলাই বিদ্বেষী’ চাটগামীর সেই স্ট্যাটাস

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শফকত হোসাইন চাটগামী তার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে ‘কোটা ইস্যুতে বাঁশখালীতে যাতে কেউ পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে তার জন্য এমপি মুজিবুর রহমান সিআইপির নির্দেশনা’— শিরোনামে একটি পোস্ট দেন।

 ওই পোস্টে শফকত হোসাইন চাটগামী বাঁশখালীর সাবেক এমপি মুজিবুর রহমান সিআইপির বরাতে লিখেন, ‘আসসালামু আলাইকুম, বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারলাম পুকুরিয়া, কালীপুর, বৈলছড়ি, চাম্বল, গুণাগরী, পুঁইছড়িতে বিএনপি, জামায়াত-শিবির কোটা ইস্যুকে পুঁজি করে নাশকতা ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে সেখানে আমার লোকজনকে সজাগ থাকার নির্দেশনা দিয়েছি। প্রশাসন ও পুলিশ সজাগ এবং সতর্ক থেকে এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি জনগণের জানমাল নিরাপত্তা দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। বিশেষ করে পুঁইছড়ি, চাম্বল ও গুণাগরী অতি গুরুত্বপূর্ণ। 

ধন্যবাদান্তে- 
মুজিবুর রহমান 
সংসদ সদস্য, 
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী)।’

‘চাটগামী অতিরঞ্জিত হয়ে এসব লিখেছে, আমি তাঁকে কিছুই বলিনি’

এদিকে শফকত হোসাইন চাটগামীর এমন স্ট্যাটাসের সত্যতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন এ প্রতিবেদক। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁশখালীর সাবেক এমপি মুজিবুর রহমান সিআইপি বলেন, ‘২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় আমি ছাত্রদের জন্য খাবার সরবরাহ করেছি। আন্দোলনের পর ছাত্ররা যখন ট্রাফিক পুলিশের ভূমিকা পালন করেছে, তখন আমি তাদের জন্য ছাতা ও খাবার সরবরাহ করেছি। এটি সবাই জানে। চাটগামী আমার বরাত দিয়ে যে স্ট্যাটাস দিয়েছে, সেটি আমার মতামতের ভিত্তিতে দেয়নি। আমার সাথে এ বিষয়ে কোনও কথা বলেনি। অতিরঞ্জিত হয়ে সে এই পোস্ট দিয়েছে।’

সরকার পতনের পর দুটি পত্রিকার প্রতিনিধিত্ব হারান চাটগামী

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চের বাঁশখালী প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন শফকত হোসাইন চাটগামী। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে বিরোধিতার জের ধরে চাটগামীকে ওই দুটি পত্রিকা থেকে অব্যাহতি দেয় কর্তৃপক্ষ।

৫ আগস্ট পরবর্তী শফকত হোসাইন চাটগামী ঢাকা থেকে প্রকাশিত এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন দৈনিক খবরের কাগজ ও চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক সাঙ্গুর বাঁশখালী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নেন।

যা বললেন সহকর্মীরা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শফকত হোসাইন চাটগামী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে বাঁশখালীতে কর্মরত সাংবাদিক মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে স্মৃতিচারণ করে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। সেখানে চাটগামীর জুলাই বিরোধী অবস্থানের কথা উল্লেখ করেছি। আমি ফেসবুকে ছাত্র-জনতার পক্ষে লেখালেখি করার কারণে আমাকে চাটগামী নানাভাবে চাপ দিয়েছিল। আবদুল আউয়াল টিপু নামের এক ছাত্রলীগ ক্যাডারকে দিয়ে ফোন করিয়েছিল আমাকে চাপে রাখার জন্য। কিন্তু আমি হার মানিনি। আজকে জুলাই বিরোধী চাটগামীকে প্রশাসন জুলাই শহীদ দিবসে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে দেখে আমার আপসোস হয়, ঘৃণা হয়।

৫ আগস্টের পর ফেসবুক আইডি ডি-অ্যাকটিভ করেন চাটগামী

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতনের পর শফকত হোসাইন চাটগামী জনরোষের হাত থেকে বাঁচতে তার ব্যক্তিগত দুটি ফেসবুক আইডি ডি-অ্যাকটিভ (নিস্ক্রিয়) করে দেন। পরে Safkat Chatgami New নামে একটি নতুন ফেসবুক আইডি চালু করেন। ওই আইডি থেকে এখনও নিয়মিত সক্রিয় শফকত হোসাইন চাটগামী। 

তবু জনরোষ থেকে বাঁচতে পারেননি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে জুলাই বিদ্বেষী আচরণের জের ধরে শফকত হোসাইন চাটগামীর বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। সেদিন চাটগামীকে মারধর করা হয় এবং মোবাইল ফোন ভাঙচুর করা হয়।

এ বিষয়ে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সংগীতশিল্পী ও রিদম সুপার স্টুডিও’র স্বত্বাধিকারী নুরুল আবছার বলেন, ৫ আগস্ট বিকেলে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কিছু ছেলেপেলে চাটগামীর বাড়িতে জড়ো হয়। সেদিন চাটগামীকে ধাওয়া দেয় এবং মোবাইল ভাঙচুর করা হয়।
640 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা