মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী>>
বাঁশখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে উঠে আসা নানা অনিয়মের অভিযোগের পর অবশেষে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জুয়েল মজুমদার ও উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (কৃত্রিম প্রজনন) সুমন কর্মকারকে শোকজ করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ যোবায়ের হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা অফিসিয়াল ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। ইতোমধ্যে তাঁদের শোকজ করা হয়েছে। জবাব পাওয়ার পর তা বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে। আপনাদের সংবাদ প্রকাশের দুই-তিন দিন পর তাঁদের শোকজ করা হয়।’
সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, ‘জেলার যেকোনো জায়গায়, যেকোনো সময় সমস্যা হলে জেলা অফিস ব্যবস্থা নেয়। জুয়েল মজুমদার ও সুমন কর্মকারকে শোকজ করা হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপনারা আপনাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছেন, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব।’
এর আগে, গত ১৬ অক্টোবর বাঁশখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাঁশখালীর সর্বাধিক পঠিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাঁশখালী টুডে। প্রতিবেদনে উঠে আসে সরকারি কর্মঘণ্টা উপেক্ষা, কর্মকর্তাদের দেরিতে অফিসে আসা, সেবার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ এবং বন্যার্ত খামারিদের জন্য বরাদ্দ সহায়তা বণ্টনে অনিয়মের চিত্র।
ঘড়ির কাঁটায় সময়, দরজায় তালা
ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১১টা ৩৮ মিনিট। অথচ সরকারি দপ্তরের একটি কক্ষে তখনো ঝুলছিল তালা। দরজার পাশের নামফলকে লেখা-সুমন কর্মকার, উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (কৃত্রিম প্রজনন)। কয়েক কদম দূরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কক্ষেও ছিল শূন্য চেয়ার।
সরকারি অফিস শুরু সকাল ৯টায়। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর।
এর ঠিক ৫১ দিন আগে, ২৫ আগস্ট, একই দপ্তরের প্রধান ডা. জুয়েল মজুমদারকে লিখিতভাবে কৈফিয়ত তলব করেছিল চট্টগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট টানা তিন দিন তিনি সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের আগে অফিসে উপস্থিত হননি। পূর্বানুমতি কিংবা যৌক্তিক কারণ ছাড়া এমন অনুপস্থিতিকে শৃঙ্খলাবিরোধী উল্লেখ করে তিন কার্যদিবসের মধ্যে জবাব চাওয়া হয়েছিল। সন্তোষজনক জবাব না পেলে একতরফা আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।
কিন্তু সেই চিঠির ৫১ দিন পেরিয়ে গেলেও দপ্তরের চিত্রে প্রত্যাশিত পরিবর্তনের প্রতিফলন পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
টানা ১০ দিন দপ্তরটি পর্যবেক্ষণ করে প্রায় একই চিত্র দেখতে পান প্রতিবেদক। ১৫ অক্টোবর বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে অফিসে আসেন ডা. জুয়েল মজুমদার। দেরিতে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘আমি দেরিতে আসব। আপনি জিজ্ঞেস করার কে? আপনাকে এখানে কে পাঠিয়েছে?’
অফিসের অ্যাসাইনমেন্টের কথা জানালে তিনি প্রতিবেদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ফোন নম্বর চান। নম্বর দেওয়ার পর আর কথা না বাড়িয়ে বলেন, ‘রসুনের কোয়া ভাগ হলেও গোড়ালি একই জায়গায়। কথা বলার দরকার নেই। আপনি আসতে পারেন।’
৩০ টাকার সেবা, খামারির পকেট থেকে ৫০০ টাকা!
সরকারি সেবার মূল্য নির্ধারিত, কিন্তু খামারিদের অভিযোগে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সুমন কর্মকারের কক্ষ বন্ধ থাকায় খামারি পরিচয়ে তাঁকে ফোন করেন প্রতিবেদক। তিনি জানান, বারান্দায় থাকা একজনকে ছাগলের সমস্যার কথা বলতে। সেখানে পশুর চিকিৎসা দিচ্ছিলেন ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট খালেছা সুলতানা মুন্নী। সুমন কর্মকারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সুমন স্যার এখনো আসেননি।’
প্রায় ১০ বছর ধরে এ দপ্তরে কর্মরত সুমন কর্মকারের বিরুদ্ধে খামারিদের অভিযোগ, গাভীর কৃত্রিম প্রজননের জন্য তিনি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেন। ছাগল খাসি করানোর ক্ষেত্রেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অথচ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সেবা প্রদান প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, হিমায়িত সিমেনের নির্ধারিত মূল্য মাত্র ৩০ টাকা।
খামারি মো. ইউনুস বলেন, ‘আমার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিয়েছে। সরকারি দাম যেখানে কয়েক টাকা, সেখানে আমাদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।’
তবে এ বিষয়ে সুমন কর্মকারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জুয়েল মজুমদার বলেন, ‘চিকিৎসার বিনিময়ে টাকা আদায় নিয়ে এ পর্যন্ত কেউ আমাকে অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’
বন্যার ক্ষত শুকায়নি, সহায়তা বণ্টনেও প্রশ্ন
বাঁশখালীতে বন্যার পানি নেমেছে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত অনেক খামারির ক্ষত এখনো শুকায়নি। এমন দুর্যোগের পর তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর কথা ছিল প্রাণিসম্পদ দপ্তরের।
আগস্টের শুরু থেকে প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) আওতায় বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার ৪০০ খামারিকে বিভিন্ন উপকরণ দেওয়া হয়। তালিকায় ছিল ভুসি, সাইলেজ, এক জোড়া গামবুট, একটি স্টিলের বালতি ও একটি থার্মোমিটার।
কিন্তু সহায়তা বণ্টনের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খামারিদের একটি অংশ। তাঁদের অভিযোগ, প্রকৃত খামারিরা বঞ্চিত হলেও যাঁদের খামার নেই, তাঁদের কেউ কেউ পেয়েছেন এসব উপকরণ।
জামশেদ ডেইরি অ্যান্ড অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী নুরুল আলম বলেন, ‘যাদের খামার নেই, তারা এই সুবিধা পেয়েছে। কেউ কেউ পৌরসভায় এসে জিনিসগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা পাইনি। অথচ বন্যায় আমার খামার নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
পুঁইছড়ির মীরপাড়ার খালেদা খানমের সাতটি গরু রয়েছে। দুগ্ধ খামারিদের ৪০ সদস্যের উৎপাদক দলের (পিজি) সদস্য হয়েও তিনি সহায়তা পাননি বলে জানান। খালেদা বলেন, ‘এই সুবিধা আমি পাইনি। একজনের জিনিস দুইজনকে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।’
একই অভিযোগ পিজি সদস্য শাকির আহমদ ও আবু তৈয়বের। তাঁদের দাবি, নিয়মিত সঞ্চয় ও সভায় অংশগ্রহণ করেও প্রাপ্য সহায়তা পাননি। শাকির আহমদ বলেন, ‘নিয়মিত ১০০ টাকা করে সঞ্চয় দিয়েছি। প্রতিটি মিটিংয়ে গেছি। কিন্তু প্রণোদনা পাইনি।’
এলএসপি হিসেবে কাজ করা উম্মে নুরী রহিমার অভিযোগ, তাঁর অধীনে থাকা ১০ জন পিজি সদস্যও সহায়তা থেকে বাদ পড়েছেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. জুয়েল মজুমদার বলেন, ‘২০২২ সাল থেকে যারা পিজি গ্রুপের সদস্য, তাদের দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কাউকে দেওয়া হয়নি।’
প্রকল্প শেষ, তবু অফিসে প্রকল্পের কর্মী!
এলডিডিপি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের একজন কর্মীর দপ্তরে যাতায়াত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে এলডিডিপির প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা পদে যোগ দেন মো. জুলকারনাইন শাওন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি বাঁশখালীতে কর্মরত ছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও তাঁকে নিয়মিত অফিসে দেখা যায়। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে পরিচিতদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ।
উম্মে নুরী রহিমা বলেন, ‘শাওন স্যারের চাকরি না থাকলেও তিনি অফিস ছাড়েননি। তাঁকে অফিসে নিয়মিত দেখা যায়।’
অভিযোগের বিষয়ে জুলকারনাইন শাওন বলেন, ‘আমি অফিসে কাজে যাই আরকি। কাজ কি থাকতে পারে না? এলডিডিপি প্রকল্পের কাজ ছিল, তাই গিয়েছি।’ তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কেন নিয়মিত অফিসে যান, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
এ ছাড়া ২২ বছর ধরে বাঁশখালীতে কর্মরত উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কে এম ফরিদুল আজিমের বিরুদ্ধেও অফিসে দেরিতে আসা ও আগে চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সকাল ১০টায় অফিসে এসে বেলা ২টায় চলে যান। চলতি মাসে তাঁর অবসরে যাওয়ার কথা। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার কাজ তো ফিল্ডে। কে অভিযোগ করেছে, তাঁকে আমার সামনে নিয়ে আসেন।’
জবাবদিহির অপেক্ষায় খামারি ও জনতা
একসময় যে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলমগীর কৈফিয়ত তলবের চিঠিতে স্বাক্ষর করেছিলেন, তিনি এখন আর চট্টগ্রামে কর্মরত নেই। প্রায় এক মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছেন নতুন জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ যোবায়ের হোসেন। দায়িত্ব নেওয়ার পরদিনই তিনি বাঁশখালী দপ্তর পরিদর্শন করেন।
তবে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে তিনি বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি চট্টগ্রামে। তাই এ বিষয়ে কিছুই জানি না। আপনার কাছ থেকে প্রথম শুনলাম।’
পরিদর্শনের বিষয়টি উল্লেখ করলে তিনি জানান, অন্য একটি কাজে সেখানে গিয়েছিলেন। পরে বলেন, ‘জুয়েল মজুমদারকে আগে কৈফিয়ত তলব করার চিঠিটি আমি দেখেছি। আমি যাচাই-বাছাই করছি।’
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতিয়ার রহমানও এ বিষয়ে জেলা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। বাকি অভিযোগ নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলে তিনি তা দেখলেও উত্তর দেননি।
অবশেষে সংবাদ প্রকাশের পর দুজন কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। এখন অপেক্ষা তাঁদের জবাবের, অপেক্ষা প্রশাসনিক তদন্তের ফলাফলের।