মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী:
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে নিরঙ্কুশ জয়লাভের পর জামায়াত এবার নতুন হিসাব কষতে শুরু করেছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দামামা বাজছে। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে বাঁশখালী উপজেলা জামায়াতে ইসলামী।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নাপোড়া মাছরাঙা কনভেনশন হলে ১১ দলীয় জোট সমর্থিত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী জহিরুল ইসলাম বিপুল ভোটে জয় লাভ করায় শুকরানা সমাবেশের আয়োজন করে উপজেলা জামায়াতে ইসলামী। এই সমাবেশ থেকে ঘোষণা আসে, উপজেলা নির্বাচনে জেতার মিশন নিয়ে মাঠে নামার বিষয়টি।
পরিসংখ্যান বলছে, এই উপজেলায় জামায়াতের জেতার বিষয়টি নতুন নয়। ২০১৪ সালে বাঁশখালী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী আলমগীর কবির চৌধুরী ও আ. লীগের প্রার্থী খোরশেদ আলমকে হারিয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে জামায়াতের প্যানেল। উপজেলা চেয়ারম্যান পদে অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম, ভাইস-চেয়ারম্যান পদে অধ্যক্ষ মাওলানা বদরুল হক ও মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যান পদে শাফিয়া বেগম মোখতার বিপুল ভোটে জয় ছিনিয়ে আনেন। সে সময় উপজেলা চেয়ারম্যান পদে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা লেয়াকত আলী।
আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে মিশন বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়ে শোকরানা সমাবেশে বাঁশখালী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মাওলানা আরিফুল্লাহ বলেন, বাঁশখালীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে শফিউল্লাহ সাহেব নির্বাচন করেছেন, মাওলানা মুমিনুল হক চৌধুরী সাহেব দুইবার নির্বাচন করেছেন। জহির ভাই ২০১৮ সালে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু সকাল ১০ টায় আমরা রাতের ভোটকে বর্জন করেছিলাম। ১৭ বছর পর বাঁশখালীর মাটি ইসলামি আন্দোলনের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।
জহিরুল ইসলামের বিপুল ভোটে জয়ের বিষয়টি সামনে এনে তিনি বলেন, আল্লাহ পাক আমাদেরকে একটি নেয়ামত দান করেছেন। এটি আমাদের জন্য আমানত। এই আমানতকে ধরে রাখার দায়িত্ব বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ছাত্র শিবির থেকে শুরু করে আমরা যারা বিগত নির্বাচনে ভোট দিয়েছি, আমাদের সবার কাঁধের মধ্যে এই আমানত রক্ষার দায়িত্ব।
আগামী উপজেলা নির্বাশনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে মাওলানা আরিফুল্লাহ বলেন, আপনারা হিসাব করে দেখবেন আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দুইজনের ভোট যদি আমরা যোগ করে দেখি, তাহলে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। তাহলে আগামী নির্বাচনে যদি দ্বিমুখী লড়াই হয়, তাহলে আমাদের কত হাজার ভোট বাড়াতে হবে, এটা আমাদের দেখতে হবে। বাঁশখালীতে যত শ্রেণির মানুষ রয়েছে, পেশাজীবি হোক, কৃষক হোক, সবাই জাতীয় নির্বাচনে আমাদের পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাই আজকে থেকে আমাদের মিশন হবে, যারা আমাদেরকে ভোট দেয়নি, দেখবেন স্থানীয় নির্বাচনে আমাদেরকে ভোট দেবে। তাই কাউকে শত্রু ভাবা যাবে না। তাই আমি আপনাদেরকে বলবো, এই ব্যক্তি ভোট দিয়েছে, ঐ ব্যক্তি ভোট দেয়নি এসব বলে পার্থক্য সৃষ্টি করা যাবে না। সব জনগণ আমাদের বন্ধু। সবাই এদেশের নাগরিক। সবার ভোটের সমান মূল্য রয়েছে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শূরা ও কর্ম পরিষদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার শহীদুল মোস্তফা বলেন, আল্লাহর একান্ত দয়ায় আমরা আজকে শুকরানা সমাবেশ করার সুযোগ পেয়েছি। পুরো চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার দুটি আসনসহ কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এই তিনটি আসন আমরা আল্লাহর দয়ায় পেয়েছি। আর বাকি আসনগুলোতে আমাদের নমিনিরা পেয়েছে। কিন্তু এখানে অভ্যন্তরীণভাবে আ. লীগ এবং বিএনপির অঘোষিত ঐক্যের মাধ্যমে অনেক ভোট পাওয়ার পরও আমাদের ভাইদেরকে আপাতত হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং, এই প্রেক্ষাপটে বাঁশখালীও যদি আমরা ঐভাবে চিন্তা করি, এখানে একক প্রার্থী হলে আমাদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। আগামীতে অনুভূতিকে সামনে নিয়ে আমরা আমাদের ঘাটতিগুলোকে পূরণ করবো। ইনশাআল্লাহ। আগামীতে উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হবে। সুতরাং, এটি আমাদের বিজয়ের সূচনা ইনশাআল্লাহ। এই জন্য আমাদেরকে এখন থেকে মাঠে নামতে হবে।
শুকরানা সমাবেশের প্রধান বক্তার বক্তব্যে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা বদরুল হক বলেন, অতীতের চাইতে আমাদের দায়িত্ব আরও বেশি বেড়ে গেছে। সর্বস্তরের মানুষের দায়িত্ব আমাদের ওপর এসে পড়েছে। আমাদের ঠান্ডা রেখে, ধৈর্য ধরে আমাদেরকে এই বিজয় দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখতে হবে। আমাদেরকে যারা ভোট দিয়েছে বা দেয়নি সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে।
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা জহিরুল ইসলাম বলেন, বাঁশখালীতে ধর্ম বর্ণ সকলের উর্ধ্বে ওঠে আমাদের কাজ করতে হবে। আমি কমিটমেন্ট দিয়েছিলাম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ে যাবো ইনশাআল্লাহ। আমরা কোথাও দালালি করবো না, আমরা দুর্নীতি করবো না। আগে নিজেরা আমল করে তারপর দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবো। খুব কম সময়ের মধ্যে তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে যাবে। বাঁশখালীর প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে, প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে আমরা যেভাবে দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের জন্য কষ্ট করেছি, তারচেয়ে বেশী করে আমরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো ইনশাআল্লাহ। সংগঠন যার পক্ষে নমিনি ঘোষণা করবে, আমরা তার পক্ষে লাব্বাঈক ঘোষণা করবো ইনশাআল্লাহ। খবরদার, আমরা পুরাতন কাপড় দিয়ে সংসার চালাবো। আমরা বিলাসী জীবনযাপন করবো না। আমীরে জামায়াতের ঘোষণা মতে, জাতীয় সংসদ সদস্যরা ফ্ল্যাট ছেড়ে দিচ্ছেন, বরাদ্দ ছেড়ে দিচ্ছেন, গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছেন। বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে গাড়ির ড্রাইভার, তেল পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে দেবেন। আমীরে জামায়াতের ঘোষণা দেখে সরকারি দলও আমাদেরকে অনুসরণ করছে। আদর্শিক এবং নৈতিকতার প্রতিযোগিতা হবে ইনশাআল্লাহ।
শুকরানা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা বদরুল হক, বাঁশখালী জামায়াতের সাবেক আমীর ইঞ্জিনিয়ার শহীদুল মোস্তফা, উপজেলা জামায়াতের বর্তমান সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা ইসমাইল, সেক্রেটারি মাওলানা আরিফুল্লাহ, নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুর রহিম ছানুবী, বাঁশখালী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি লায়ন মো. আমিরুল হক (এমরুল কায়েস), উপজেলা জামায়াতের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জিএম সাইফুল ইসলাম এবং ইসলামি ছাত্রশিবিরের চট্টগ্রাম পশ্চিম জেলার সভাপতি আবদুর রহিম প্রমুখ।
সূত্র: একুশে পত্রিকা।