☰

বাঁশখালীতে ফ্যামিলি কার্ড শুমারি সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ তালিকায় ছাত্রলীগ নেতা

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
বাঁশখালীতে ফ্যামিলি কার্ড শুমারি সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ তালিকায় ছাত্রলীগ নেতা কালীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আ. লীগ নেতা আ ন ম শাহাদাত আলমের সাথে ছাত্রলীগ নেতা আরফিন উদ্দিন
#৫০ শতাংশ নারীদের অগ্রাধিকারের কথা থাকলেও মানা হয়নি

#নিয়োগপ্রাপ্তদের ৯৮ শতাংশ ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত

#নিয়োগ তালিকায় স্থান পাননি দলীয় পরিচয়ের বাইরে থাকা সাধারণ আবেদনকারীরা

#তালিকায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৪ জন, ইউএনও’র দায় স্বীকার, তদন্তের ঘোষণা

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী:
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ফ্যামিলি কার্ড শুমারি তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ তালিকায় ছাত্রলীগ নেতার নাম ও দলীয় সাইনবোর্ডের বাইরে থাকা সাধারণ আবেদনকারীর নাম আসেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়োগ তালিকায় নাম আসা ৯৮ শতাংশ ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সাথে জড়িত। এছাড়াও নিয়োগ তালিকায় ৫০ শতাংশ নারী অগ্রাধিকারের কথা থাকলেও তা মানা হয়নি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রুহুল আমিন ও সমাজসেবা অফিসার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন স্বাক্ষরিত একটি তালিকা গত ১৮ আগস্ট ভোর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর যোগ্য প্রার্থী ও সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দেয়। বাঁশখালীর ১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার শতাধিক আবেদনকারী এ অনিয়মের অভিযোগ করেছেন।

ছনুয়া ইউনিয়নে নাজিম উদ্দিন মোহাম্মদ রায়হান নামের এক ছাত্রলীগ নেতাকে সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রায়হান ছনুয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়াও একই ইউনিয়নের ২নম্বর ওয়ার্ডে মোহাম্মদ নুরুন্নবী নামের এক ছাত্রদল নেতাকে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নুরুন্নবী বেলাল উদ্দিন নামের এক সাংবাদিককে হত্যাচেষ্টা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি।

হাসান মুহাম্মদ জুনাঈদ রাসেল নামের এক ছাত্রদল নেতা বলেন, ‘লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় ভালো করার পরও আমার নাম আসেনি। আমি মাস্টার্স পাস করেছি। অথচ একজন ছাত্রলীগ ক্যাডারকে সুপারভাইজার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সে ডিগ্রি পাস। তার সার্টিফিকেট নিয়ে বিতর্ক আছে।’

ছাত্রদল নেতা জুনাঈদ রাসেল অভিযোগ করে বলেন, ‘যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন, বাঁশখালী বিএনপির রাজনীতিতে তারা সবাই চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পার অনুসারী। আমি আমার মামা ইফতেখার হোসেন চৌধুরী মহসিনের রাজনীতি করি বলে আমার নাম বাদ গেছে।’

অভিযোগ রয়েছে, কালীপুর ইউনিয়নের সুপারভাইজার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতা আরফিন উদ্দিন। আরফিন বাঁশখালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী মুহাম্মদ গালীব সাদলী (গালিব)-এর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং কালীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও পলাতক আ. লীগ নেতা আ ন ম শাহাদাত আলমের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। এ সংক্রান্ত বিভিন্ন ছবি এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।

ছনুয়া ইউনিয়ন থেকে সুপারভাইজার পদে আবেদন করেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন ফয়সাল। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেছি। আমার সম যোগ্যতা অন্য আবেদনকারীদের নেই। একমাত্র আমার অপরাধ, আমি জামায়াতের রাজনীতি করি।’

গণ্ডামারা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে আবেদন করেছিলেন জান্নাতুল মাওয়া। তিনি মাস্টার্সে অধ্যয়ন করছেন চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে। জান্নাতুল মাওয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘গণ্ডামারা ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে আমরা চারজন প্রতিযোগী ছিলাম। এরমধ্যে দু’জন নারী, দু’জন পুরুষ। তার মধ্যে শুধু আমি আগে মাঠকর্মী হিসেবে কাজ করেছিলাম। অভিজ্ঞতা আছে এবং বিএ করা আছে। বাকিরা এইচএসসি পাস। কিন্তু সেখানে এক ছেলেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, নিয়োগ প্রক্রিয়া যদি ব্যক্তি বিবেচনায় সম্পন্ন হয়, তাহলে কেন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সাধারণ আবেদনকারীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করা হলো?

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘দরখাস্ত পড়েছে দুই হাজারের অধিক, নিয়োগ পাবেন মাত্র ১৭৫ জনের মতো, বাকি ১৬০০ জন তো অভিযোগ করবেই। সবাইকে তো নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়।’

ছাত্রলীগ নেতারা নিয়োগ পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তালিকায় ছাত্রলীগের ৩ থেকে ৪ জনের নাম এসেছে এমন মেসেজ পেয়েছি। এটি নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। অধিকতর তদন্ত করে তাদের নাম বাদ দেওয়া হবে।’

মেয়েদের নাম বাদ পড়ার বিষয়ে রুহুল আমিন বলেন, ‘নিয়োগ তালিকায় ৫০ শতাংশ মেয়েদের অগ্রাধিকারের কথা আছে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিদের মধ্যে মেয়ে কম ছিল। তাই নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি।’

অনেকে লিখিত ও মৌখিত পরীক্ষায় ভালো করা স্বত্বেও তাদের নাম আসেনি— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পরীক্ষায় ভালো করার পাশাপাশি অনেকের মাঠের অভিজ্ঞতাও বিবেচনা করা হয়েছে। এটা যেহেতু মাঠ থেকে উপকারীভোগীদের নাম তুলে আনতে। অনেক পরিশ্রমের একটা কাজ।’

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, গোপনে সুপারিশের ভিত্তিতে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এতে সাধারণ যোগ্য ও মেধাবী আবেদনকারীদের মেধার মূল্যায়ন হয়নি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে যেকোনো ধরনের সুপারিশ কিংবা তদবির সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে প্রচার করা হলেও বাস্তবে তা কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ ছিল বলে অভিযোগ করেছেন প্রার্থীরা।

তাদের মতে, তালিকা প্রকাশের পর দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র, যেখানে মৌখিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য বা পিছিয়ে থাকা প্রার্থীরা চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন, অথচ অনেক যোগ্য আবেদনকারী চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন।

এর আগে দ্বিতীয় ধাপে সার্টিফিকেট যাচাই-বাছাইয়ের সময় থেকেই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম শুরু হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এ নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও উপজেলা প্রশাসন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

নিয়োগে এই অস্বচ্ছতার প্রতিবাদে এবং বিতর্কিত এই তালিকা বাতিলের দাবিতে ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়ে দ্রুত এই নিয়োগ বাতিল করে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও মেধার ভিত্তিতে পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানান।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাঁশখালী উপজেলা সমাজসেবা অফিসার আমজাদ হোসাইনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও কোনো সংযোগ পাওয়া যায়নি।

775 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা