☰

ফোনের ওপাশে মৃত্যুসংবাদ, নিভে গেল সুমাইয়ার স্বপ্নের প্রদীপ

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
ফোনের ওপাশে মৃত্যুসংবাদ, নিভে গেল সুমাইয়ার স্বপ্নের প্রদীপ ইনসেটে নিহত সুমাইয়া
নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে:
সকালের সূর্য তখনও পুরোপুরি আকাশে উঠেনি। ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুকে নিয়ে কলেজের পথে রওনা হয়েছিল সুমাইয়া জান্নাত। নতুন হোস্টেল, নতুন জীবন আর উচ্চশিক্ষার নতুন অধ্যায়ের হাতছানি ছিল তার সামনে। কিন্তু নিয়তির নির্মম লিখন কে ঠেকাবে? কলেজে পৌঁছানোর আগেই থেমে গেল তার জীবনের পথচলা।
মেয়ের খোঁজ নিতে পথে থাকা অবস্থায় মুঠোফোনে কল করেছিলেন বাবা আরিফুর রহমান। জানতে চেয়েছিলেন, মেয়ে কত দূর এগিয়েছে। কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো এমন এক সংবাদ, যা কোনো বাবার কানে শোনার জন্য নয়।

—“মোবাইলের মালিক বেঁচে নেই।”
মাত্র কয়েকটি শব্দ। অথচ সেই শব্দেই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল এক বাবার সমস্ত পৃথিবী।

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আরিফুর রহমান বলেন, “বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে। হঠাৎ শুনলাম সে আর নেই। আমার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মেয়েটা স্বপ্ন দেখত লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করবে, পরিবারের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো আজ লাশের কাফনের সঙ্গে ঢেকে গেল।”

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়ার চুনতি বাজার এলাকায় দুই বাসের ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জান্নাত (২০)।

বাঁশখালীর পুঁইছড়ি ইউনিয়নের আরবশাহ্ ঘোনা এলাকার আরবশাহ্ জমিদার বাড়ির মেয়ে সুমাইয়া ছিলেন পরিবারের বড় সন্তান। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার আগে স্বপ্ন দেখতে শিখেছিলেন তিনি। বাবা মসজিদের ইমাম, কর্মস্থল রাঙ্গুনিয়ায়। আর মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে থাকতেন কক্সবাজারের চকরিয়ার মালুমঘাটে নানাবাড়িতে।

সেদিন ছিল হোস্টেলের সিট বরাদ্দের দিন। কলেজ থেকে জানানো হয়েছিল, অভিভাবককে সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে বাবা রাঙ্গুনিয়া থেকে রওনা হন, আর মেয়ে চকরিয়া থেকে। কিন্তু তাদের সেই দেখা আর হলো না।

হাসপাতালের মেঝেতে মেয়ের নিথর দেহের পাশে বসে বিলাপ করছিলেন মা ইয়াছমিন আক্তার। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলছিলেন, “সকাল সাতটায় ভাত খেয়ে তাড়াহুড়া করে বের হয়ে গেল। আমি বলেছিলাম, আর পাঁচ মিনিট পরে যেও। কিন্তু সে শুনল না। এখন মনে হয়, যদি পাঁচ মিনিট পরে বের হতো, হয়তো আমার মেয়েটা আজ বেঁচে থাকত।”

মায়ের এই আক্ষেপ যেন সময়ের বুক চিরে ওঠা এক দীর্ঘশ্বাস—যার উত্তর আর কখনো মিলবে না।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে হাইওয়ে পুলিশ জানায়, কক্সবাজারগামী ইম্পিরিয়াল পরিবহনের একটি বাস ও চট্টগ্রামগামী পূরবী পরিবহনের আরেকটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে উভয় বাসের সামনের অংশ দুমড়ে-মুচড়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় সুমাইয়াকে উদ্ধার করে লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দোহাজারী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন চৌধুরী জানান, দুর্ঘটনাকবলিত দুটি বাস জব্দ করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই চালকেরা পালিয়ে যান। আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এদিকে হাসপাতালের বারান্দাজুড়ে তখন শুধু কান্নার শব্দ। এক পাশে বাবার নিঃশব্দ অশ্রু, অন্য পাশে মায়ের বুকফাটা আহাজারি। আর মাঝখানে শুয়ে আছে এক তরুণীর নিথর দেহ—যে কলেজের হোস্টেলে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে বের হয়েছিল, কিন্তু ফিরে এলো সাদা কাফনে মোড়ানো হয়ে।

সুমাইয়ার মৃত্যু যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—জীবন কত অনিশ্চিত, আর স্বপ্নগুলো কত সহজেই থেমে যেতে পারে মহাসড়কের এক মুহূর্তের বিভীষিকায়।
270 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা