নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাঁশখালীর ছনুয়া ইউনিয়নে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে আফ্রিকা প্রবাসী নাজিম উদ্দীন তালুকদারসহ কয়েকজন যুবককে জড়িয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় এখন তাদেরই লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।
শনিবার (১৬ মে) ভোরে বাঁশখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম সরওয়ারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ছনুয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের খুদুকখালী মান্নানপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে নিজ বাড়ি থেকে মাদক কারবারি মো. হেফাজকে গ্রেপ্তার করে। হেফাজ খুদুকখালী গ্রামের মান্নানপাড়ার মৃত আবদুল মালেক ওরফে মালেক বলীর ছেলে।
পুলিশ জানায়, হেফাজ দীর্ঘদিন ধরে বাঁশখালীর বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইয়াবা সরবরাহের সঙ্গে জড়িত ছিল। তার অধীনে অন্তত ডজনখানেক ব্যক্তি মাদক পরিবহনের কাজ করতেন। সম্প্রতি ছনুয়া ইউনিয়নের আবদুল্লাহর দোকান এলাকায় স্থানীয় সচেতন যুবসমাজের উদ্যোগে আয়োজিত মাদকবিরোধী মানববন্ধনে হেফাজের নেতৃত্বে হামলা ও মারধরের ঘটনা ঘটে। এরপর থেকেই তাকে নজরদারিতে রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
গ্রেপ্তারের সময় তিন পিস ইয়াবা ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। পরে শনিবার (১৬ মে) দুপুরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড ও এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন বাঁশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. ওমর সানি আকন।
তবে আদালতে দেওয়া প্রাথমিক জবানবন্দিতে হেফাজ দাবি করেন, ছনুয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আফ্রিকা প্রবাসী নাজিম উদ্দীনের নেতৃত্বে শোয়াইব, হোছাইন ও ছরওয়ার আলম নামের কয়েকজনের মাধ্যমে ইয়াবা তার কাছে পৌঁছাতো। এ বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত মাদক কারবারিদের আড়াল করতে এবং ব্যক্তিগত ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে নিরীহ ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের নাম জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ দুই দশকের প্রবাস জীবন নাজিম উদ্দীনের
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ছনুয়া ইউনিয়নের মরহুম হাজী অছি উদ্দীন ও তমিজ উদ্দীন পাড়ার প্রয়াত শিক্ষক গোলাম সোলতান তালুকদারের সন্তান নাজিম উদ্দীন তালুকদার ওরফে নাজু দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার মোজাম্বিকে বসবাস করছেন। ২০০৬ সালে তিনি প্রবাসে পাড়ি জমান। প্রায় দুই দশকের প্রবাস জীবনে তিনি দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সম্পৃক্ত ছিলেন।
নাজিম উদ্দীন একজন পরিচিত ভলিবল খেলোয়াড় হিসেবেও এলাকায় সুপরিচিত। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভলিবল টুর্নামেন্ট তার অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। গরিব ও এতিম মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা, সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগের জন্য স্থানীয়ভাবে তার সুনাম রয়েছে।
সম্প্রতি দেশে ফিরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। তিনি ছনুয়া ইউনিয়ন বিএনপির সম্ভাব্য সভাপতি পদপ্রার্থী এবং আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন।
যে কারণে নাজিম উদ্দীনকে ‘ভিলেন’ বানানো হলো
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও সমাজসেবক নাজিম উদ্দীনের কাছে স্থানীয় সচেতন যুব সমাজ মাদক কারবারি হেফাজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে যান। সচেতন যুবকরা নাজিমকে বলেন, হেফাজের কারণে তাদের পাড়ার নাম ‘ইয়াবাপাড়া’ হয়ে গেছে। যার কারণে ওই এলাকার ছেলেমেয়েদের বিয়ে হচ্ছে না। নালিশের প্রেক্ষিতে হেফাজকে ডেকে মাদক থেকে দূরে থাকার আহবান জানান নাজিম। এসময় তাকে অনুরোধ করে বলেন, ‘আরও বিভিন্ন বৈধ পেশা আছে। অবৈধ পেশা ছেড়ে দিয়ে বৈধ পথে ইনকাম করো।’
তখন থেকে প্রবাসী নাজিম উদ্দীনকে একহাত নেন হেফাজ।
এ বিষয়ে প্রবাসী নাজিম উদ্দীন বলেন, আমি তাকে ভালো পথে আসার আহ্বান জানিয়েছি। এরপর থেকে সে আমার ওপর ক্ষুব্ধ। এখন আমাকেই ভিলেন বানিয়ে দিল। আমি এর নিন্দা জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাংবাদিক বেলাল উদ্দিন বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করে আসছি। এলাকায় কোথায় কী হচ্ছে ; সব বিষয়ে বেশ আর কম অবগত আছি। কিন্তু নাজিম উদ্দীন নামের ওই ব্যক্তি সম্পর্কে আজ পর্যন্ত এই ধরনের তথ্য আমার কাছে আসেনি। তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। মূলত চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেওয়ায় ‘রেজাইয়া’ নামের এক ব্যক্তির চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছেন নাজিম উদ্দীন নাজু। এখানে হেফাজকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে নাজিমকে ভিলেন বানানোর জন্য। রেজাইয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেপরোয়া ছিল মাদক কারবারি হেফাজ।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়ায় কাল হলো তিন জনের
প্রবাসী নাজিম উদ্দীনের অনুরোধেও হেফাজ সৎ পথে না আসায় এলাকার যুব সমাজকে মাদকের মাধ্যমে অন্ধকার জগতে নিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় সচেতন যুব সমাজ ছনুয়া ইউনিয়নের আবদুল্লাহর দোকান এলাকায় মাদকবিরোধী মানববন্ধনের আয়োজন করেন। উক্ত মানববন্ধনে অংশ নিয়ে হেফাজের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন হোছাইন, শোয়াইব ও ছরওয়ার। পরবর্তীতে গ্রেপ্তারের পর হেফাজের জবানবন্দিতে তাদের নাম উল্লেখ করা হলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এলাকাবাসীর দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তিন যুবকের নাম জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে মো. শোয়াইব বলেন, এলাকার যুব সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখার লক্ষ্যে আমি হেফাজের বিরুদ্ধে মানববন্ধনে অংশ নিয়েছি এবং তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছি। যার কারণে আমি তার চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছি। সে আমার নামে ম্যাজিস্ট্রেটকে মিথ্যা জবানবন্দি দিয়েছে। এলাকায় এসে মানুষের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করলে আমি এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত কিনা জানা যাবে।