☰

বাঁশখালীর ২১টি গ্রামে বালু উত্তোলনের মহোৎসব, নীরব ভূমিকায় প্রশাসন

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
বাঁশখালীর ২১টি গ্রামে বালু উত্তোলনের মহোৎসব, নীরব ভূমিকায় প্রশাসন পুকুরিয়ায় তৈলারদ্বীপ সেতুর দক্ষিণ পাশে পিএবি সড়ক ঘেঁষে অবৈধভাবে তুলে স্তূপ করে রাখা বালু।— বাঁশখালী টুডে
সাঙ্গু নদী ও পাহাড়ি ছড়ায় অবাধ বালু উত্তোলন; ঝুঁকিতে তৈলারদ্বীপ সেতু, নদীতীর, কৃষিজমি ও বসতভিটা

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী >>
বাঁশখালী উপজেলার সাঙ্গু নদী এবং বিভিন্ন ইউনিয়নের পাহাড়ি ছড়া থেকে প্রতিনিয়ত অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে একটি প্রভাবশালী চক্র। বিশেষ করে পুকুরিয়া ও খানখানাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্টে নদীতীরবর্তী এলাকায় বালু উত্তোলন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার ও বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে বালু উত্তোলন চললেও কার্যকর প্রতিকার মিলছে না। প্রশাসনের নীরবতা অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের আরও উৎসাহিত করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, তৈলারদ্বীপ সেতুর দক্ষিণ পাশে পিএবি প্রধান সড়ক সংলগ্ন এলাকায় ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন ও স্তূপ করে রাখা হয়েছে। সেখানে ‘শিরোপা বিল্ডার্স’ নামে একটি সাইনবোর্ডে বালু বিক্রয় ও সরবরাহের কার্যাদেশ হিসেবে ‘ডলুখাল বালুমহাল, চন্দনাইশ, চট্টগ্রাম’-এর নাম উল্লেখ রয়েছে। সাইনবোর্ডে স্মারক নম্বর হিসেবে ০৫.৪২.১৫০০.৩০২.১০.১১৪.২০২৪.৯০৫ উল্লেখ করে আদেশক্রমে জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম লেখা রয়েছে। ডাম্পিং পয়েন্টের পরিচয়ে সেখানে বালু মজুত ও বিক্রির কার্যক্রম চলছে। তবে ডলুখাল বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন ও সরবরাহের অনুমোদন থাকলেও সেই অনুমোদন সাঙ্গু নদীর তীরবর্তী এলাকায় বালু উত্তোলনের বৈধতা দেয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনুমোদিত উৎস থেকে বালু এনে বিক্রি করা এবং অনুমোদনবহির্ভূত স্থান থেকে বালু উত্তোলন-দুটি ভিন্ন বিষয়।

এদিকে পুকুরিয়া ইউনিয়নের তেচ্ছিপাড়া এবং খানখানাবাদের বিভিন্ন পয়েন্টেও সরকারি অনুমোদন ছাড়াই বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু তুলে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও তলদেশের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শুধু সাঙ্গু নদী নয়, বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়নের পাহাড়ি ছড়াতেও বালু উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সাধনপুরের মৌলভীঘোনা ও পানিছড়া, কালীপুর ইউনিয়ন পরিষদের পূর্ব পাশে জঙ্গল কোকদণ্ডী ছড়া, ফকির মোহাম্মদপাড়া এলাকার পূর্ব দিকের পাহাড়ি ছড়া, বৈলছড়ী ইউনিয়নের পূর্ব বৈলছড়ী, অভ্যারখীল, পূর্ব চেচুরিয়া খদুলাপাড়া ও জলদী চুম্মাপাড়া এলাকায় দেদারসে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে।

এ ছাড়া বাঁশখালী পৌরসভার কাজীরপাড়া ও মানিকপাড়া, চাম্বল ইউনিয়নের পূর্ব চাম্বল মিয়ার দোকানের পূর্ব পাশের ধুইল্লা ঝিরি, চাম্বল ফরেস্ট অফিস রোড, আদর্শগ্রাম, পাতলা মার্কেট, সোনারখীল, নাপোড়া গ্রামের মীরপাড়া ও ভিলেজারপাড়া, পূর্ব পুঁইছড়ি এবং দক্ষিণ পুঁইছড়ির পাহাড়ি ছড়ায় যন্ত্র বসিয়ে বালু উত্তোলন ও ট্রাকযোগে পরিবহন করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব এলাকায় ইজারা ও অনুমোদনের শর্ত উপেক্ষা করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বালু উত্তোলন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত। 

 পুকুরিয়ার বাসিন্দা মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘অপরিকল্পিতভাবে নদীর তলদেশ খনন করা হলে স্রোতের গতিপথ ও তলদেশের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে তৈলারদ্বীপ সেতুর আশপাশে অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিং চললে নদীর তলদেশ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তলদেশ অতিরিক্ত গভীর হয়ে গেলে সেতুর পিলারের আশপাশের মাটি সরে যাওয়া বা ক্ষয় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বর্ষা মৌসুমে নদীর প্রবল স্রোতে তীরভাঙন বাড়লে কৃষিজমি, বসতভিটা ও যোগাযোগ অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়তে পারে।’

খানখানাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা আহমদ হোসেন, নুরুল কবির ও সোহেল রানা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চোখের সামনে প্রতিদিন নদী ও ছড়া থেকে বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে। আমরা বহুবার স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। প্রশাসনের নীরব ভূমিকা অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।’

তৈলারদ্বীপ সাঙ্গু সেতুর দক্ষিণ পাশে বালু মজুত ও বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ‘শিরোপা বিল্ডার্স’-এর সাকিব সিকদার শাহীন বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নিয়ে অন্য স্থান থেকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু এনে বিক্রি করছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘তৈলারদ্বীপ সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই। তবে ডলুখাল থেকে বালু এনে বিক্রির অনুমোদন রয়েছে। উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
267 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা