নিজস্ব প্রতিবেদক, বাঁশখালী টুডে>>
নদীর বুকে বালুর স্তূপ, তীরে তীরে ড্রেজারের দৌরাত্ম্য-অবৈধ বালু উত্তোলনের এমন অভিযোগে যখন পরিবেশ ও জনপদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছিল উদ্বেগ, তখন অবশেষে অভিযানে নেমেছে বাঁশখালী উপজেলা প্রশাসন। তবে সাতটি বালুমহালে অভিযান চালিয়ে কিছু সরঞ্জাম জব্দ করেই কি দায়িত্ব শেষ, নাকি বন্ধ হবে বালু উত্তোলনের নেপথ্যের অনিয়ম-এ প্রশ্নও উঠছে সচেতন মহলে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) দিনব্যাপী উপজেলার খানখানাবাদ, সাধনপুর ও পুকুরিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় সাতটি স্থানে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে অন্তত ৭০টি ড্রেজার পাইপ ও একটি এক্সকাভেটর জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাঙ্গু নদীর সঙ্গে সংযোগকারী দুটি ড্রেজার পাইপ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, খানখানাবাদ ইউনিয়নের রায়ছটা গ্রামের ঈশ্বর বাবুর হাট ও চৌধুরী ঘাট এলাকার চারটি স্থানে অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ৬৪টি অবৈধ ড্রেজার পাইপ জব্দ করে অকেজো করা হয়। অন্যদিকে সাধনপুর ইউনিয়নের দুটি স্থানে অভিযান চালিয়ে আরও চার থেকে পাঁচটি ড্রেজার পাইপ জব্দ করা হয়েছে।
সাঙ্গু নদীতে বালু উত্তোলন, জব্দ এক্সকাভেটর
অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পুকুরিয়া ইউনিয়নের তৈলারদ্বীপ সেতুসংলগ্ন এলাকা। সেখানে ‘শিরোপা বিল্ডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বালু উত্তোলন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় উপজেলা প্রশাসন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটি সাঙ্গু নদী থেকে বালু উত্তোলন করছে।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির চন্দনাইশ উপজেলার ডলুখাল বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলন এবং পুকুরিয়ার ওই ডাম্পিং পয়েন্ট ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। তবে সাঙ্গু নদী থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি নেই। এ কারণে নদীর সঙ্গে সংযোগকারী দুটি ড্রেজার পাইপ বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির একটি এক্সকাভেটর জব্দ করা হয়েছে।
বাঁশখালী টুডের প্রতিবেদন, তারপরই অভিযান
এর আগে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ‘বাঁশখালীর ২১টি গ্রামে বালু উত্তোলনের মহোৎসব, নীরব ভূমিকায় প্রশাসন’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাঁশখালীর সর্বাধিক পঠিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাঁশখালী টুডে। প্রতিবেদনে অবৈধ বালু উত্তোলন, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিনই মাঠে নামে উপজেলা প্রশাসন। ফলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে-দীর্ঘদিনের অভিযোগের পর এই অভিযান কি অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের কার্যকর সূচনা, নাকি সাময়িক তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে প্রশাসনিক উদ্যোগ?
অভিযানের অংশ হিসেবে শিরোপা বিল্ডার্সকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনার এখতিয়ারসংক্রান্ত কাগজপত্র উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত কাগজপত্র দাখিল করতে ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বালু জব্দ, জিম্মায় জনপ্রতিনিধিরা
অভিযান চলাকালে বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন পরিমাণ বালুও জব্দ করা হয়। জব্দ করা বালু স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট সদস্যদের জিম্মায় রাখা হয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তামজিদুর রহমান তন্ময় বলেন, “অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। যেসব স্থানে অনুমোদন ছাড়া বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অভিযান পরিচালনাকালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, থানাপুলিশের বিশেষ টিম ও ইউনিয়ন পরিষদের গ্রামপুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নদী বাঁচলেই বাঁচবে জনপদ
নদী কেবল জলধারা নয়, এটি জনপদের প্রাণ, জীবিকা ও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম অবলম্বন। সেই নদীর বুক থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু তুলে নেওয়া হলে তীরভাঙন বাড়তে পারে, নষ্ট হতে পারে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য। ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে সেতু, সড়ক ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও।
তাই কেবল ড্রেজার পাইপ জব্দ কিংবা এক্সকাভেটর আটকেই অভিযান শেষ হলে চলবে না-অবৈধ উত্তোলনের উৎস চিহ্নিত করা, অনুমোদনের শর্ত যাচাই, নিয়মিত নজরদারি এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের এই অভিযান যেন ক্ষণিকের তৎপরতা হয়ে না থাকে; বরং সাঙ্গু নদী ও বাঁশখালীর পরিবেশ রক্ষায় তা হয়ে উঠুক ধারাবাহিক কার্যকর পদক্ষেপ। নদীর বুক থেকে বালু লুটের অভিযোগ থামুক, নিরাপদ থাকুক সেতু-জনপদ, রক্ষা পাক প্রকৃতির ভারসাম্য-এটাই এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।