মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী:
গণ্ডামারার জনপদে শিক্ষা বিস্তারের এক স্বপ্নযাত্রার ছয় বছর পূর্ণ হলো। সময়ের স্রোত বেয়ে প্রতিষ্ঠার ষষ্ঠ বর্ষে পদার্পণ করেছে আনোয়ারা বেগম স্কুল অ্যান্ড কলেজ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আবেগঘন এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে প্রতিষ্ঠানটির জন্মকথা, সংগ্রাম ও সাফল্যের নানা অধ্যায় স্মরণ করেছেন প্রতিষ্ঠাতা এবং গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী।
তিনি জানান, ১৯৮৫ সালে সীতাকুণ্ডের কুমিরা আবাসিক উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি করানোর সময় তাঁর কৃষক বাবা একটি কথাই বলেছিলেন—“বড় হয়ে এলাকায় একটি ভালো মানের স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে।” বাবার সেই স্বপ্ন ও নির্দেশনাকেই জীবনের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে ধারণ করেছিলেন তিনি। দীর্ঘ পথচলার পর সেই স্বপ্নেরই বাস্তব রূপ আজকের আনোয়ারা বেগম স্কুল অ্যান্ড কলেজ।
প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় মানে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও রাজনৈতিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে দীর্ঘ পাঁচ বছর পাঠদানের অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম থেমে থাকেনি। জাতীয় মানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে অবিরত চেষ্টা করেছেন তিনি। রাজনৈতিক কারণে ৫ বছর পাঠদানের অনুমতি না পেলেও সাবেক সচিব হাবিবুল কবির দুলু ভাইয়ের সহানুভূতি নিয়ে সরল আমিরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে পাঠদান চলছে।
সাফল্যের খতিয়ানও কম নয়। ২০২২ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে দুই শিক্ষার্থী ট্যালেন্টপুল ও সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি লাভ করে। ২০২৫ সালে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী সরকারি বৃত্তি অর্জন করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি করে। এসএসসির প্রথম ব্যাচে ১১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজন জিপিএ-৫, সাতজন ‘এ’ এবং তিনজন ‘এ-’ পেয়ে শতভাগ পাসের গৌরব অর্জন করে। ২০২৫ সালে ২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে দুইজন জিপিএ-৫ ও ২০ জন ‘এ’ গ্রেড পেয়ে ৯০ শতাংশ পাসের হার নিশ্চিত করে। চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী রয়েছে ৩৯ জন।
প্রায় এক একর ৯৩ শতক জমির ওপর গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটির চারপাশে নির্মাণ করা হয়েছে সীমানা প্রাচীর। প্রতিষ্ঠাতা লেয়াকত আলী ইতোমধ্যে ৭৫ শতক জমি দান করেছেন এবং ভবিষ্যতে কলেজ কার্যক্রম সম্প্রসারণের সময় অবশিষ্ট জমিও দান করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
শিক্ষার পাশাপাশি অবকাঠামোগত উন্নয়নেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের পৃথক কক্ষ, অফিস সহকারীর কার্যালয়, আবাসিক সুবিধা, পুকুর, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য মসজিদ, সার্বক্ষণিক জেনারেটর এবং প্রশস্ত খেলার মাঠ—সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাঙ্গনে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে এই অর্জনের পেছনে রয়েছে নীরব সংগ্রামের গল্পও। তিনি জানান, প্রতি মাসে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয় মেটাতে তাকে হিমশিম খেতে হয়। প্রতিমাসে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় করতে হয় বলে জানান তিনি। রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে গত ছয় বছরে কোনো সরকারি অনুদান না পাওয়ার আক্ষেপও তুলে ধরেন তিনি। ভবিষ্যতেও অনুদান পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে জানান তিনি।
সবশেষে তিনি বলেন, জীবনের অবশিষ্ট সময় যেন নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসা দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাটিয়ে যেতে পারেন—সেজন্য সকলের কাছে আন্তরিক দোয়া কামনা করেছেন।
গণ্ডামারার আকাশে আজ ছয় বছরের এক আলোকবর্তিকার উৎসব। একজন কৃষক পিতার স্বপ্ন, এক সন্তানের অঙ্গীকার এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলা আনোয়ারা বেগম স্কুল অ্যান্ড কলেজ যেন আগামী দিনেও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।