স্বামীর ‘দ্বিতীয় বিয়ের’ তথ্য জানাই কি কাল হলো জান্নাতুলের?

  • ১৪ নভেম্বর ২০২৫
স্বামীর ‘দ্বিতীয় বিয়ের’ তথ্য জানাই কি কাল হলো জান্নাতুলের?


নিজস্ব প্রতিবেদক:

মাত্র  ১৯ দিন। বিয়ের সানাইয়ের সুর তখনও বাতাসে মিলিয়ে যায়নি। নতুন জীবনের যে স্বপ্ন নিয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস (২০) শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেছিলেন, সেই স্বপ্নই যেন তার জন্য এক বিভীষিকাময় ফাঁদ হয়ে দাঁড়ালো। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সরল ইউনিয়নে বিয়ের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এই নববধূর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। মেহেদির রঙে রাঙানো হাত দুটি নিথর হয়ে যাওয়ার এই ঘটনায় হতবিহ্বল সবাই।

বুধবার (১২ নভেম্বর) সকালে সরল ইউনিয়নের মিনজিরীতলা গ্রামের শ্বশুরবাড়ি থেকে যখন জান্নাতুল ফেরদৌসের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়, তখন যেন এক নিমিষে সব আনন্দ বিষাদে রূপ নেয়। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, এটি আত্মহত্যা নয়, স্পষ্টতই যৌতুকের দাবিতে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

গত ২৩ অক্টোবর সরল ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পাইরাং গ্রামের মোজাম্মেল ড্রাইভারের বাড়ির মুজিবুল হকের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের বিয়ে হয়েছিল একই ইউনিয়নের মিনজিরীতলা গ্রামের পরানী বাড়ির মোস্তাক আহমদের ছেলে মো. শাহাব উদ্দিনের সঙ্গে।

প্রতিবেশীদের ভাষ্যমতে, বিয়েতে জান্নাতুলের পরিবার চুক্তি অনুযায়ী প্রায় চার শতাধিক অতিথি আপ্যায়ন করে এবং পাঁচ পদের ফার্নিচারও উপহার হিসেবে দেয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই আয়োজন আর উপহার সামগ্রী মোটেও ‘পছন্দমতো’ হয়নি বর মো. শাহাব উদ্দিন ও তার পরিবারের। ফলস্বরূপ, বিয়ের পরদিন থেকেই নববধূর ওপর নেমে আসে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে শুরু হয় দাম্পত্য জীবনের তীব্র অশান্তি।

নিহত জান্নাতুল ফেরদৌসের মা মোবাশ্বেরা বেগমের বুকফাটা আর্তনাদ যেন পুরো মিনজিরীতলার আকাশ ভারী করে তুলেছে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে যে অভিযোগ তুলেছেন, তা আরও বেশি চাঞ্চল্যকর। মোবাশ্বেরা বেগম বলেন, “শাহাব উদ্দিনের এটি দ্বিতীয় বিয়ে। সে আমাদেরকে তার আগের বিয়ের কথা সম্পূর্ণ গোপন করে আমার মেয়েকে বিয়ে করে। আগের ঘরে তার একটি সন্তানও রয়েছে।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, “জান্নাতুল ফেরদৌস বুধবার রাতে স্বামীর মোবাইলে সেই প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে অসঙ্গত ছবি দেখতে পায়। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। এর এক পর্যায়েই শাহাব উদ্দিন আমার মেয়েকে বিয়ের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় যৌতুকের জন্য গলা টিপে ও বালিশ চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছে। আমরা আমাদের মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।”

তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্বামী মো. শাহাব উদ্দিন। তিনি দাবি করেছেন, “আমার স্ত্রী রাতে এশার নামাজও পড়েছে। কিন্তু এরপর কিভাবে এটা ঘটলো আমি কিছুই বুঝতে পারতেছি না।”

এই মৃত্যু ঘিরে পুলিশি তদন্তে তৃতীয় একটি দিকও উঠে এসেছে। বাঁশখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুধাংশু শেখর হালদার জানান, “প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, দুই বছর আগে জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে বেলাল উদ্দিন নামের এক প্রবাসীর সম্পর্ক ছিল। বিয়ের পর ওই প্রবাসী যুবক (বেলাল উদ্দিন) ফোন করে বিষয়টি তার স্বামী শাহাব উদ্দিনকে জানায়।”

সুধাংশু শেখর হালদার আরও জানান, এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়েছিল, তবে পরে তারা বিষয়টি মিটমাটও করে ফেলেন। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, নববধূ আত্মহত্যা করেছেন।

জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যু কি সত্যিই আত্মহত্যা? নাকি মায়ের অভিযোগের মতোই যৌতুক, প্রতারণা আর নির্যাতনের বলি হয়ে খুন হয়েছেন তিনি? নাকি এর পেছনে প্রবাসীর ফোনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে? সব প্রশ্নের উত্তর এখন ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষায়।

জান্নাতুল ফেরদৌসের মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে।


175 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা