মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী:
বাঁশখালী আইনজীবী সমিতির বার্ষিক নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলা। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর ২০ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, চলতি বছর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়।
বাঁশখালী আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব না হওয়ায় নির্বাচন কমিশন সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের নতুন তারিখ ঘোষণা করে নোটিশ জারি করে।
এদিকে, সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বর্তমান কার্যকরী কমিটির মেয়াদ গত ২০ জানুয়ারি শেষ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণে গত ১৯ জানুয়ারি সকল সদস্যের অংশগ্রহণে একটি জরুরি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচন ও দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান কার্যকরী কমিটির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
তবে সভা চলাকালে কয়েকজন আইনজীবী এডহক কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন এবং আর ফিরে আসেননি। পরে বর্তমান কমিটি বর্ধিত দায়িত্ব পালনে অসম্মতি জানালে উপস্থিত সদস্যদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনার পাশাপাশি সমিতির সার্বিক দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এ অবস্থায় গত ২০ জানুয়ারি কয়েকজন আইনজীবী নিয়ম বহির্ভূতভাবে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি এডহক কমিটি গঠন করেন। অভিযোগ রয়েছে, এতে দুইজন ইসকন সদস্য এবং বাকি তিনজনের মধ্যে আদালতের এপিপি অ্যাডভোকেট বোরহান উদ্দিন, যিনি সদ্য বিদায়ী কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন, অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
জানা যায়, এর আগে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণ মূলক নির্বাচনের লক্ষ্যে গত ৭ জানুয়ারি অ্যাডভোকেট তকছিমুল গণী চৌধুরী ইমনকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অ্যাডভোকেট লুৎফর হায়দার রিয়াদ এবং অ্যাডভোকেট তাপস কান্তি সুশীলকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ করা হয়। তবে ২০ জানুয়ারি রিয়াদ ও তাপস পদত্যাগ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আইনজীবী বলেন, ‘আইনের মানুষ যদি নিজেরাই বেআইনি কাজে জড়ায়, তাহলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার কীভাবে প্রত্যাশা করবে?’
নিয়ম বহির্ভূত এডহক কমিটি গঠনের ঘটনায় সমিতির অধিকাংশ সদস্যের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। তাঁদের অভিযোগ, কথিত এডহক কমিটি বার ফরম, ওকালতনামা ও স্টিকারসহ বিভিন্ন সামগ্রী ছাপিয়ে প্রচার করছে, যা সমিতির স্বার্থের পরিপন্থী।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, গত ২০ ডিসেম্বর স্বঘোষিত এডহক কমিটি আদালতের আইনজীবী সহকারীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে টাউট ও দালালবিরোধী সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি অপসারণ করে। এতে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
এ বিষয়ে বাঁশখালী আইনজীবী সমিতির প্রধান নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট তকছিমুল গণী চৌধুরী ইমন বলেন, ‘বার্ষিক সাধারণ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে আমাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং আমার সঙ্গে আরও দুইজনকে সহকারী নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত ২০ জানুয়ারি বিভিন্ন চাপের মুখে আমার দুই সহকারী পদত্যাগ করেন। তবুও সমিতির স্বার্থ রক্ষায় আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সঙ্গে পরামর্শ করে আমি জেনেছি, নতুন করে দুইজন সহকারী নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা না করেই এডহক কমিটির মাধ্যমে বার ফরম, ওকালতনামা ও স্টিকার ছাপানো হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অনৈতিক। নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিদের কাছে দায়িত্ব ও হিসাবপত্র হস্তান্তর করা নির্বাচন কমিশনের আইনগত বাধ্যবাধকতা। এ ক্ষেত্রে কোনো বিধিবহির্ভূত আচরণ কাম্য নয়।’
এদিকে দ্রুত সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে চলমান সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছেন সমিতির সাধারণ সদস্যরা।
সদ্য মেয়াদ শেষ হওয়া কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট মনিরুল আলম চৌধুরী বাবুল বলেন, পূর্বের কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় সভা ডেকে সমিতির সকল সদস্যদের সম্মতিক্রমে সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতির মতো আমরাও নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনার পাশাপাশি সমিতির সার্বিক দায়িত্বভার হস্তান্তর করি। কিন্তু তা মেনে না নিয়ে গুটিকয়েক সদস্য নিয়মবহির্ভূত ভাবে এডহক কমিটি গঠন করেছেন। যা নিয়মবহির্ভূত।
সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতিকে অনুসরণ করে বাঁশখালীতেও নির্বাচন কমিশনারদের সার্বিক দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে, এমতাবস্থায় আপনারা কেন এডহক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেন— এমন প্রশ্নের জবাবে নবগঠিত এডহক কমিটির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট দিলীপ কুমার দাস বলেন, আমাদের সমিতির গঠনতন্ত্রের ১০ ধারায় উল্লেখ আছে যে, যদি কোনও কারণে নির্বাচন না হয়, তাহলে ৫ সদস্য বিশিষ্ট এডহক কমিটি গঠন করতে হবে। সেই গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমরা কমিটি গঠন করেছি। সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতিতে কি হয়েছে সেটি আমাদের দেখার বিষয় নয়। আমাদের বারের সভায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সর্বসম্মতিক্রমে কি পাস হয়েছে, সেটি মূখ্য বিষয়।
নতুনভাবে ওকালতনামা ও বার ফরম ছাপানোর বিষয়ে তিনি বলেন, যখন আমাদের এডহক কমিটি দায়িত্বভার গ্রহণ করলো, তখন পুরনো কমিটির কাছে আমরা চিঠি ইস্যু করেছি, তাদের সমস্ত ওকালতনামা এবং হিসাবপত্র যা আছে, সেগুলো এডহক কমিটির কাছে হস্তান্তর করার জন্য। আমরা ঐ চিঠির কপি সরাসরি এবং ডাকযোগে পাঠিয়েছি। এরপরও তাদের সাড়া না পাওয়ায় কোর্টের কার্যক্রম চলমান রাখার স্বার্থে আমরা ওকালতনামা এবং বার ফরম ছাপাতে বাধ্য হয়েছি। যাতে বিচার প্রার্থীদের ভোগান্তির শিকার হতে না হয়।
জোরপূর্বক দু'জন নির্বাচন কমিশনারকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে পুরোনো কমিটির নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেছেন— এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে অ্যাডভোকেট দিলীপ কুমার দাস বলেন, এখানে যেহেতু এডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেহেতু ইলেকশন কমিশনের কোনও পাওয়ার নেই। এডহক কমিটি যখন নতুনভাবে নির্বাচনের আয়োজন করবে, তখন নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হবে।
সূত্র: একুশে পত্রিকা।