বাঁশখালীতে আমার দেখা ‘জুলাই অভ্যুত্থান’

  • ২৬ নভেম্বর ২০২৫
বাঁশখালীতে আমার দেখা ‘জুলাই অভ্যুত্থান’ ফাইল ছবি
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন>>
১৬ জুলাই ২০২৪। ফেসবুকের নীলজলে ভাসছিল এক তীক্ষ্ণ ব্যথার ঢেউ। ছোট্ট একটি ভিডিও, কিন্তু আমার বুকের ভেতর তা যেন বজ্রাঘাতের মতো বাজতে থাকে বারবার। পুলিশের গুলিতে মুহূর্তেই ঝাঁঝরা হয়ে গেল এক যুবকের দেহ। নাম তার আবু সাঈদ। ভিডিওর প্রতিটি ফ্রেমে আমার মনে জন্ম নিল হাজার প্রশ্ন, তার মায়ের বুকের হাহাকার কি কখনও থামবে? রাষ্ট্রের অস্ত্র চালাতে কি এতটুকু মমতা লাগে না? মানুষের বুকে তাক করে কি সত্যিই গুলি করার প্রয়োজন ছিল?

সেদিন আমার ভেতরে জমে উঠল অদৃশ্য আগুন, আবু সাঈদের ত্যাগ থেকে শক্তি নিয়ে আমার মতো হাজারো তরুণ দেশের রাস্তায় নেমে এল একটাই দাবিতে ‘হাসিনার পদত্যাগ’।

১. জুলাইয়ের জ্বলন্ত দিনগুলো

২৯ জুলাই ২০২৪।
বাঁশখালীর গুণাগরী মোড়ে ব্যানার-পোস্টার হাতে নেমে এল বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের সাথে যোগ দিল বাঁশখালীর আনাচে-কানাচের তরুণ তুর্কি।  কিন্তু দাবির কণ্ঠ উচ্চারিত হওয়া মাত্রই পুলিশ তাদের ব্যানার ছিনিয়ে নিল, নেমে এল লাঠির বর্ষণ। কিছু ছেলেকে ছত্রভঙ্গ করে মোবাইল কেড়ে নিল তারা।

এমন সময় পশ্চিম চাম্বল বাংলা বাজার এলাকার আবদুর রহমানের ফোন। সেই কণ্ঠ যেন ফুঁপিয়ে ওঠা নদীর মতো কাঁপছিল, “ভাইয়া… রামদাস ফাঁড়ির পুলিশ আমাদের মোবাইল নিয়ে গেছে। এখন কলেজের অনলাইন ক্লাসটা চালাব কী দিয়ে?”

তার অসহায় শব্দগুলো আমার হৃদয়ে গেঁথে গেল তীরের মতো। আমি ফোন করলাম থানার অপারেশন অফিসার কায়কোবাদকে। অনুরোধ করলাম, “ছেলেগুলোর মোবাইল ফিরিয়ে দিন।” উনি বললেন, “আপনি পাঠান, আমি সেখানকার ইনচার্জক তপন কুমার বাগচিকে বলে দিচ্ছি।”

কিন্তু আবদুর রহমান থানায় যেতে ভয় পাচ্ছিল।
আমি আবার ফোন করি, আবার অনুরোধ জানাই। শেষ পর্যন্ত আমার চেষ্টায় ডজনখানেক ছাত্রের মোবাইল ফিরে আসে। সেদিন আবদুর রহমান কেঁদে বলেছিল, “বড় ভাই, আমার মা আজ আপনার জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করেছেন। আল্লাহ আপনাকে হাজার বছর বাঁচাইয়া রাখুক।” তার সেই বাক্যটি আজও আমার বুকের মধ্যে দোয়া হয়ে বেজে ওঠে।

২. ‘হুজুর, আপনার বেলাল বেশি বাড়াবাড়ি করছে’

৩০ জুলাই ২০২৪।
ভোরের আলো ওঠার আগেই ফোন এলো বাঁশখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি শফকত হোসাইন চাটগামীর। “বেলাল, এমন উত্তাল দেশে তুমি স্ট্যাটাস দিচ্ছ… তুমি কি পরিস্থিতি বোঝো না?” আমি বললাম, “আমি ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছি। এত রক্ত ঝরছে… আর কত চুপ থাকব?”

উনি বললেন, “পৌরসভার ছাত্রলীগ নেতা আবদুল আউয়াল টিপু বলে গেছে... ‘হুজুর, আপনার বেলাল বেশি বাড়াবাড়ি করছে। সরকারের বিরুদ্ধে অনবরত লিখে যাচ্ছে। তাকে থামান।’’ ওই একটি বাক্য হঠাৎ যেন আমার দিকে ছুটে আসা গরম বাতাস। কিন্তু সত্য চাপা দেওয়ার ক্ষমতা কারও নেই।

৩. বহদ্দারহাটের নীল আকাশও সেদিন অশ্রুসজল

৩১ জুলাই ২০২৪।
কারফিউ, উত্তেজনা, ইন্টারনেটহীন এক নির্জন শহর।
বহদ্দারহাট যেন বারুদের গন্ধে ভারী। পুলিশ ফ্লাইওভারের উপর-নিচে সাজানো। আমার সোর্স বলল— “ভাই, ছাত্রদের ওপর টিয়ার শেল আর ফাঁকা গুলি।”

আমার রক্তে তখন আর কোনো নির্দেশ কাজ করছিল না। আমি ভিডিও নিতে বের হলাম। জীবন রক্ষার তাগিদে মোবাইল থেকে পোস্ট মুছে ফেললাম। ওই পথে দাঁড়িয়ে থাকা অস্ত্রধারীদের কথা মাথায় রেখে মোবাইল ওয়ালপেপারে বসালাম আওয়ামী লীগ নেতা লিটনের সাথে থাকা আমার ছবি বেঁচে থাকার কৌশলও সেদিন ছিল রাজনৈতিক।

৪. কারফিউর অন্ধকারেও সংবাদপত্রের শব্দ ছিল আলো

১ আগস্ট ২০২৪।
ইন্টারনেটহীন একাকিত্ব।

সকালে ছাপা পত্রিকা কিনতে যেতাম। তখন ছাপা পত্রিকার পাঠকপ্রিয়তা বেড়ে গিয়েছিল। সব পত্রিকা সার্কুলেশন বাড়িয়ে দিয়েছি। ঘড়ির কাঁটায় সকাল ৯টা গড়াতেই পত্রিকার স্টল শূন্য হয়ে যেতো। তাই ৯টার পরে পত্রিকা পাওয়া দুষ্কু ছিল। কারণ সেদিন কাগজের কালিই ছিল সত্য জানার একমাত্র পথ।৷ সন্ধ্যায় একুশে পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক রুকন ভাইয়ের বাসায় যেতেই ফ্লাইওভারের মুখে আমাকে থামাল পুলিশ।
“কারফিউ দেখস না? কোথায় যাস?” চকবাজার মুখী রিকশায় থাকা ভয়ার্ত বৃদ্ধ দম্পতিকেও নামিয়ে দেয় পুলিশ। আমি পরিচয়পত্র দেখাতে তারা বলল, “ভুল হইছে ভাই, যান।” এই ‘ভুল’ শব্দটিই যেন সেদিনের দেশের প্রতিচ্ছবি।

৫. প্রয়াত সম্পাদক আজাদ তালুকদারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা

২ আগস্ট ২০২৪।

একুশে পত্রিকার টিম নিয়ে আমরা গেলাম রাঙ্গুনিয়া। রুকন ভাই আমাকে ফুলের তোড়া অর্ডার করার দায়িত্ব দেন। বহদ্দারহাট ইসলামি ব্যাংকের নিচে অবস্থিত একটি ফুলের দোকানে আমি ফুলের তোড়া অর্ডার দিই। এরপর আমরা নোহা গাড়ি ভর্তি করে ছুটলাম সম্পাদক মহোদয়ের স্মৃতি বিজড়িত রাঙ্গুনিয়ার উত্তর পদুয়া গ্রামের দিকে। যেখানে আজাদ স্যারের অনুপস্থিতি এখনও বাতাসে ঝুলে থাকে।

৬. আগস্টের রাত—সন্দেহ, ভয় আর সতর্কতার ছায়া

৩ আগস্ট ২০২৪।

চট্টগ্রাম শহর তখন উত্তেজনার কুয়াশায় ঢাকা। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নওফেল গ্রুপ ও নাছির গ্রুপ এবং হেলাল আকবর বাবরের নেতৃত্বে এক হয়ে নেমেছে ছাত্রদের দমাতে। আমাদের বিল্ডিংয়ের প্রতিটি ফ্ল্যাটে নোটিশ... “আজ রাতে ডিবি আসবে, ছাত্ররা সতর্ক থাকো।” আমি বইপত্র সরিয়ে রাখলাম। শুধু সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র কাছে রাখলাম। কারণ, শুধু ‘ছাত্র’ পরিচয়ই তখন ছিল অপরাধের সমান। চট্টগ্রাম শহরের পরিস্থিতি বেগতিক হওয়ায় আমি সেদিন পাড়ি জমিয়েছিলাম গ্রামের বাড়ি বাঁশখালীতে। কিন্তু বাঁশখালীতে গিয়েও কঠিন সাক্ষী ও পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম।

৭. শেখেরখীলের রাস্তায় রক্ত, আর চাম্বল জেনারেল হাসপাতালের আর্তনাদ

৪ আগস্ট ২০২৪।
শহর থেকে গ্রামে চলে এলেও শান্তি নেই। খবর এলো চাম্বল বাজার ও শেখেরখীল রাস্তার  মাথায় ছাত্রদের ওপর নেমে এসেছে নৃশংসতা। আমি ছুটলাম ঘটনাস্থলে। চোখের সামনে এলোপাতাড়ি গুলিতে পড়ে গেলেন সাগর উল্লাহ।  সে একজন ভাঙারি মাল বিক্রেতা, আর মাদ্রাসা ছাত্র সাকিবও গুলিবিদ্ধ হলো। সাগর উল্লাহকে আমরা কোলে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু ন্যায়বিচারের পথ তখনও অন্ধকারে ডুবে। এখানে থেমে যাইনি। সাগর উল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে ন্যায় বিচারের লক্ষ্য নিয়ে আমি নিজে বাদী হয়ে মামলা করি বাঁশখালী থানায়। 

৮. ৫ আগস্ট—একটি পতন, একটি বিজয়, একটি নতুন প্রভাত

ইন্টারনেট খুলতেই খবর। হাসিনা দেশ ছাড়ছেন। সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। সেদিন দুপুরে ভাত ঠান্ডা হয়ে রইল হাঁড়িতেই। আমি ছুটলাম বহদ্দারহাট মোড়ে। দেখলাম মানুষের ঢল, পতাকার সমুদ্র, কেউ মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, কেউ উচ্চস্বরে বলছে, “এই মূহুর্তে খবর এলো, খুনি হাসিনার পতন হলো।” আমি কলা-পাউরুটির স্বাদে অনুভব করলাম স্বাধীনতার গন্ধ।

৯. সত্য বলার দায়

সাগর উল্লাহ এক দরিদ্র মানুষ। আইনের পথে হাঁটার শক্তি নেই। তার চিকিৎসার খরচই ছিল অসহায়তার পাহাড়। সাগরকে সাহায্য করেছি আমি। গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী, পুকুরিয়ার চেয়ারম্যান আসহাব উদ্দিন, এবং জামায়াত নেতা জহিরুল ইসলামের সহায়তায় সাগর উল্লাহর ওষুধ ও চিকিৎসার বোঝা আমরা ভাগ করে নিয়েছি। তার অনুমতি নিয়ে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর থানায় মামলা দিই ন্যায় বিচারের আশায়। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে সেই দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম।

কিন্তু আজ কিছু বিএনপি নামধারী মানুষ আমাকে স্বৈরাচারের দোসর বলে অপবাদ দেয়। আমি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যে তিনটি আইসিটি মামলার শিকার হয়েছি সত্য লেখার কারণে, যে ২০২০ সালে ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদের অনুগত সন্ত্রাসীদের হাতে অপহৃত হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছি। এরপরও আমাকে যদি কেউ স্বৈরাচারের দোসর বলে, তাহলে সমস্যা আমার নয়। এটি তাদের জন্মগত ত্রুটি।

আমি শুধু প্রশ্ন রাখি, সত্য লেখা কি অপরাধ? সত্য বললে কি সবাই শত্রু হয়ে যায়? আমি দালালি করি না, কারও সেবাদাস নই। আমি শুধু কলমকে সত্যের পায়ে দাঁড় করাতে চাই। যত হুমকি আসুক, যত অপবাদ জমুক আকাশে।

লেখক:
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন
বাঁশখালী প্রতিনিধি, একুশে পত্রিকা/ দৈনিক সময়ের আলো/ সময়ের কন্ঠস্বর।
251 জন পড়েছেন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বাঁশখালীতে উৎপাদিত চা পাতা